তাসাওউফ ও সুফীদের ব্যাপারে চার মাযহাবের ইমামদের অবস্থান
১- ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ
- তাঁর যুগে ‘সুফীবাদের’ বিদ‘আত প্রকাশিত হয়নি; বরং তাঁর যুগে ছিল ‘যুহদ’-এর লোকেরা, যারা কিতাব ও সুন্নায় অটল ছিলেন।
- যে কথা বলা হয়, আবু হানিফা চল্লিশ বছর এশার ওযু দিয়ে ফজরের সালাত পড়েছেন, কিংবা তিনি এক রাকাতে পুরো কুরআন মাজীদ খতম করতেন[১]—এসব কিছুই তাঁর ওপর মিথ্যা-বানোয়াট।
- কারণ এর বর্ণনাকারীরা অজ্ঞাত এবং দুর্বল: হামাদ ইবন কুরাইশ, আহমদ ইবন হুসাইন আল-বালখী, আলী ইবনে মুহসিন আল-মুআদ্দিল, আবু মুহাম্মাদ ইবন ইয়াকুব আল-হারিসী। খাতিব আল-বাগদাদী তাঁকে মিথ্যুক বলেছেন[২], যিনি সনদ বানিয়ে নিতেন। ইমাম যাহাবীও তাঁকে দুর্বল বলেছেন।[৩]
২- ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ
- ক্বাযী ‘ইয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: তানিসী বলেন, আমরা মালিক ইবন আনাসের কাছে বসা ছিলাম।
এক ব্যক্তি বলল: হে আবু আবদুল্লাহ, আমাদের এখানে কিছু লোক আছে, যাদেরকে সুফী বলা হয়। তারা বেশি খায়, তারপর কাসীদা পড়ে, তারপর উঠে নাচে।
মালিক বললেন: তারা কি ছেলে-পেলে?
সে বলল: না।
মালিক বললেন: তারা কি পাগল?
সে বলল: না, বরং কিছু জ্ঞানী বুযুর্গ।
তখন মালিক বললেন: আমরা তো শুনিনি যে, মুসলিমদের কেউ এ কাজ করে!
লোকটি আবার বলল: তারা খায়, তারপর উঠে নাচে, কেউ মাথায় মারে, কেউ মুখে মারে।
তখন মালিক হাসলেন এবং ঘরে চলে গেলেন।[৪] - ইমাম মালিক নওহ (বিলাপ) ও সুফীদের কবিতা শিক্ষা/লিখনকে অপছন্দ করতেন।[৫]
ক্বাযী ‘ইয়াদ ব্যাখ্যা করেন: এর অর্থ হলো সুফীদের বিলাপ-ধর্মী কবিতা। যে মনে করে এটা আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম—সে পথভ্রষ্ট ও অন্যদেরকেও পথভ্রষ্টকারী।[৬] - মদীনায় গানের ব্যাপারে মালিককে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: এটি তো আমাদের কাছে ফাসেকরা করে থাকে।[৭]
- কিছু সুফী যেমন কুশাইরী তার রিসালা কুশাইরিয়া (পৃ. ৩৩৬)-তে বা কুরতুবী কাশফুল কিনা‘-এ উল্লেখ করেছেন যে, মালিক গানের ব্যাপারে ছাড় দিয়েছিলেন—এটি তাঁর ওপর মিথ্যা।
ইমাম তর্তুশী বলেছেন: সুফীবাদের মাযহাব হলো বেকারত্ব, অজ্ঞতা ও গোমরাহী। আর ইসলাম কেবল কিতাব ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ।[৮] - যে উক্তি ইবন আজীবা মালিকের নামে বর্ণনা করেছেন: “যে তাসাওউফ করল কিন্তু ফিকহ শিখল না সে যিন্দীক, আর যে ফিকহ শিখল কিন্তু তাসাওউফ করল না সে ফাসেক, আর যে দুটো একত্র করল সে বাস্তবতায় পৌঁছল।”[৯]—এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। মালিকের কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া যায় না।
- একইভাবে, যে গল্প বলা হয় মালিক আবু জাফর আল-মানসুরকে কবরের দিকে মুখ ফিরিয়ে দো‘আ করার অনুমতি দিয়েছিলেন—এটিও মিথ্যা। ইবন আব্দুল হাদী প্রমাণ করেছেন যে, এর সনদ মুনকাতি‘ (ছিন্ন) ও অন্ধকার।[১০]
৩- ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ
- ইবনে কুদামা বলেন, হাসান ইবন আবদুল আযীয বর্ণনা করেন, আমি ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি: “আমি ইরাকে এমন কিছু রেখে এসেছি, যার নাম ‘তাগবীর’ (সুফীদের গান)। এটা জিন্দীকরা উদ্ভাবন করেছে, যা দিয়ে তারা মানুষকে কুরআন থেকে ফিরিয়ে রাখে।”[১১]
- ইবনুল জাওযী বলেন, ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর শিষ্যদের বড় আলেমরা সঙ্গীত/গান (সামা‘) অস্বীকার করেছেন।[১২]
- ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন: কেউ যদি গান শুনতে অভ্যস্ত হয়, তবে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তার আদল নষ্ট হয়।[১৩]
- সুফীরা যা ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর নামে বর্ণনা করেছে—যেমন তিনি কবর থেকে বরকত নিতেন বা কবরে গিয়ে দো‘আ করতেন—সব মিথ্যা।
- যেমন বলা হয় তিনি আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর কবর থেকে তাওয়াসসুল করতেন—এটি মিথ্যা। আলবানী এটিকে দ্বাঈফা (১/৩১)-এ দুর্বল বলেছেন।
- ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ নিজেই বলেছেন: “আমি অপছন্দ করি, কোনো মাখলুককে এত বড় করা যাতে তার কবর মসজিদ হয়ে যায়।”[১৪]
- ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর নামে যে উক্তি আনা হয়: “তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে প্রিয় তিনটি: অতিরিক্ত ঝামেলা না করা, মানুষের সাথে কোমল ব্যবহার, আর সুফীদের পথে চলা।”[১৫]—এটি মিথ্যা, এর কোনো সনদ নেই।
- বরং ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে বলেছেন (তাঁর শিষ্য ইউনুস ইবন আব্দুল আ‘লা থেকে): “যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি সুফীবাদে ঢুকে যোহরের আগেই সে পাগল হয়ে যাবে।”[১৬]
- আরেক বর্ণনায়: “কেউ যদি চল্লিশ দিন সুফীদের সাথে থাকে, তার বুদ্ধি আর ফিরে আসে না।”[১৭]
৪- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ
- তাঁর যুগে তাসাওউফ দর্শনমূলক দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু তিনি যখন আত্মশুদ্ধি নিয়ে লিখেছেন, তাঁর গ্রন্থের নাম দিয়েছেন আল-যুহদ, নাম রাখেননি তাসাওউফ।
- যখন তাঁকে সুফীদের গান (তাগবীর) নিয়ে প্রশ্ন করা হয় যে এটি হৃদয় কোমল করে, তিনি বললেন: “এটি বিদ‘আত।”[১৮]
- আবার তাকে বলা হলো: সুফীদের কাসিদা নিয়ে কী বলবেন? তিনি বললেন: “বিদ‘আত, তাদের সাথে বসা যাবে না।”[১৯]
- তাঁর শিক্ষক ইয়াযীদ ইবন হারুন বলতেন: “তাগবীর তো কেবল ফাসিকরা করে। কবে থেকে তাগবীর চালু হলো?”[২০]
- ইমাম আহমাদকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, সুফীদের মনের ওপর আসা বিশেষ অবস্থা ও হাল-মকাম নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে, তিনি বললেন: “তাদের থেকে বেঁচে থাকো।”[২১]
- তিনি বললেন: “সাহাবী ও তাবেঈ তো এসব বিষয়ে কথা বলেননি।”[২২]
- খতীব বাগদাদী বলেন, আহমাদ ইবনে হাম্বল হারিস আল-মুহাসিবীর ‘কালাম’-এর বইগুলো অপছন্দ করতেন এবং লোকদের তাকে থেকে বিরত করতেন।[২৩]
- আহমদ বলেছিলেন: “হারিস থেকে মানুষকে সতর্ক কর, সে ফিতনার মূল।”[২৪]
- আবার সুফী সিররি আস-সাকাতীর একটি বানোয়াট কথা শোনানো হলে তিনি বললেন: “তাদের থেকে মানুষকে দূরে সরাও।” এবং আরেক বর্ণনায় বললেন: “এটা কুফর।”[২৫]
সুতরাং এখন সত্য পরিষ্কার হলো, বাতিলের আড়াল সরে গেল। বুঝা গেল যে,
- ইসলামে যুহদ ও যাহেদ (দুনিয়াবিমুখতা ও দুনিয়াবিমুখী) এর স্থান অনেক উপরে। যার ভিত্তি অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নির্ধারিত। যাতে নেই কোনো বিদ‘আত, নেই কোনো বিভ্রান্তি।
- সূফীবাদ ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় না।
- সূফীবাদ বিদ‘আত ও বিভ্রান্তি।
- সূফীবাদ কোনো ইলমী বিষয় না।
- সূফীবাদ বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শন থেকে আমদানিকৃত।
- সূফীবাদের সাথে প্রখ্যাত চার ইমামের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
- ইমাম আবু হানিফার সময়ে সূফীবাদের তখনো উত্থান ঘটেনি।
- ইমাম মালেকের সময় এর কিছু কিছু বিরল কাজ দেখা গিয়েছিল, যা নিয়ে ইমাম মালেক তাদেরকে পাগলের প্রলাপ মনে করে এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
- ইমাম শাফেয়ীর সময়ে তাদের কিছু কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল কিন্তু ইমাম শাফেয়ী তাদের কঠোর নিন্দা করেন।
- ইমাম আহমাদের সময় তাদের প্রসার হতে থাকলে ইমাম আহমাদ তাদের থেকে লোকজনকে সাবধান করেছিলেন।
- সূফীরা তাদের বিদ‘আত, কুফর, শিরক, কুসংস্কার এর পঁচা পণ্য চালু করার জন্য সম্মানিত চার ইমামকে নিজেদের দিকে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা করে থাকে।
তথ্যসূত্র: ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত।
- [১]তারিখে বাগদাদ (১৩/৩৫৪)।
- [২]তারিখে বাগদাদ (১০/১২৬)।
- [৩]মীযানুল ই‘তিদাল (২/৪৯৬)।
- [৪]তারতীবুল মাদারিক (১/১৮০); মানাকিব মালিক আজ-জাওয়াবি, পৃ. ১৫৮।
- [৫]আল-মুদাওয়ানা (৪/৪২১)।
- [৬]আল-মি‘ইয়ার আল-মু‘আরাব (১১/৩৩)।
- [৭]ইবনুল জাওযী, তালবিসু ইবলিস, পৃ. ২৮২।
- [৮]তাফসীরে কুরতুবী (১১/২৩৭)।
- [৯]ইকাযুল হিমাম (১/৫), আত-তাররুফ ৮।
- [১০]আস-সারিমুল মুনকি, পৃ. ২৫৫-২৫৭।
- [১১]যমু মা ‘আলাইহিম মুতাসাওউফা, পৃ. ৭।
- [১২]তালবিসু ইবলিস, পৃ. ২৮৩।
- [১৩]তালবিসু ইবলিস, পৃ. ২৮৩-২৮৪।
- [১৪]আল-উম্ম (১/২৭৮)।
- [১৫]কাশফুল খিফা (২/৪০৮)।
- [১৬]হিলইয়াতুল আওলিয়া (৯/১৫১); তালবিস ইবলিস, পৃ. ৪৪৭।
- [১৭]তালবিসু ইবলিস, পৃ. ৪৪৭।
- [১৮]মাসাইলুল ইমাম আহমাদ (২/২৭৪)।
- [১৯]মাসাইলুল ইমাম আহমাদ (২/২৭৬)।
- [২০]সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (৯/৩৫৮), তারিখে বাগদাদ (১৪/৩৩৭)।
- [২১]আদাবুশ শারঈয়্যাহ (২/৮২)।
- [২২]তাবাকাতুল হানাবিলা (১/১১৩), মানাকিব আহমদ, ২৩২।
- [২৩]তারিখে বাগদাদ (৮/২১৪)।
- [২৪]তালবিসু ইবলিস, ২০৭।
- [২৫]তালবিসু ইবলিস, ২০৯; লিসানুল মীযান (৩/১৮)।