bn বাংলা
বাংলা বাংলা
English English
عربي عربي


+8801575-547999
সকাল ৯টা হতে রাত ১০টা
Community Welfare Initiative

তাসাওউফ ও সুফীদের ব্যাপারে চার মাযহাবের ইমামদের অবস্থান

১- ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ

  • তাঁর যুগে ‘সুফীবাদের’ বিদ‘আত প্রকাশিত হয়নি; বরং তাঁর যুগে ছিল ‘যুহদ’-এর লোকেরা, যারা কিতাব ও সুন্নায় অটল ছিলেন।
  • যে কথা বলা হয়, আবু হানিফা চল্লিশ বছর এশার ওযু দিয়ে ফজরের সালাত পড়েছেন, কিংবা তিনি এক রাকাতে পুরো কুরআন মাজীদ খতম করতেন[১]—এসব কিছুই তাঁর ওপর মিথ্যা-বানোয়াট।
  • কারণ এর বর্ণনাকারীরা অজ্ঞাত এবং দুর্বল: হামাদ ইবন কুরাইশ, আহমদ ইবন হুসাইন আল-বালখী, আলী ইবনে মুহসিন আল-মুআদ্দিল, আবু মুহাম্মাদ ইবন ইয়াকুব আল-হারিসী। খাতিব আল-বাগদাদী তাঁকে মিথ্যুক বলেছেন[২], যিনি সনদ বানিয়ে নিতেন। ইমাম যাহাবীও তাঁকে দুর্বল বলেছেন।[৩]

২- ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ

  • ক্বাযী ‘ইয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: তানিসী বলেন, আমরা মালিক ইবন আনাসের কাছে বসা ছিলাম।
    এক ব্যক্তি বলল: হে আবু আবদুল্লাহ, আমাদের এখানে কিছু লোক আছে, যাদেরকে সুফী বলা হয়। তারা বেশি খায়, তারপর কাসীদা পড়ে, তারপর উঠে নাচে।
    মালিক বললেন: তারা কি ছেলে-পেলে?
    সে বলল: না।
    মালিক বললেন: তারা কি পাগল?
    সে বলল: না, বরং কিছু জ্ঞানী বুযুর্গ।
    তখন মালিক বললেন: আমরা তো শুনিনি যে, মুসলিমদের কেউ এ কাজ করে!
    লোকটি আবার বলল: তারা খায়, তারপর উঠে নাচে, কেউ মাথায় মারে, কেউ মুখে মারে।
    তখন মালিক হাসলেন এবং ঘরে চলে গেলেন।[৪]
  • ইমাম মালিক নওহ (বিলাপ) ও সুফীদের কবিতা শিক্ষা/লিখনকে অপছন্দ করতেন।[৫]
    ক্বাযী ‘ইয়াদ ব্যাখ্যা করেন: এর অর্থ হলো সুফীদের বিলাপ-ধর্মী কবিতা। যে মনে করে এটা আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম—সে পথভ্রষ্ট ও অন্যদেরকেও পথভ্রষ্টকারী।[৬]
  • মদীনায় গানের ব্যাপারে মালিককে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: এটি তো আমাদের কাছে ফাসেকরা করে থাকে।[৭]
  • কিছু সুফী যেমন কুশাইরী তার রিসালা কুশাইরিয়া (পৃ. ৩৩৬)-তে বা কুরতুবী কাশফুল কিনা‘-এ উল্লেখ করেছেন যে, মালিক গানের ব্যাপারে ছাড় দিয়েছিলেন—এটি তাঁর ওপর মিথ্যা।
    ইমাম তর্তুশী বলেছেন: সুফীবাদের মাযহাব হলো বেকারত্ব, অজ্ঞতা ও গোমরাহী। আর ইসলাম কেবল কিতাব ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ।[৮]
  • যে উক্তি ইবন আজীবা মালিকের নামে বর্ণনা করেছেন: “যে তাসাওউফ করল কিন্তু ফিকহ শিখল না সে যিন্দীক, আর যে ফিকহ শিখল কিন্তু তাসাওউফ করল না সে ফাসেক, আর যে দুটো একত্র করল সে বাস্তবতায় পৌঁছল।”[৯]—এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। মালিকের কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া যায় না।
  • একইভাবে, যে গল্প বলা হয় মালিক আবু জাফর আল-মানসুরকে কবরের দিকে মুখ ফিরিয়ে দো‘আ করার অনুমতি দিয়েছিলেন—এটিও মিথ্যা। ইবন আব্দুল হাদী প্রমাণ করেছেন যে, এর সনদ মুনকাতি‘ (ছিন্ন) ও অন্ধকার।[১০]

৩- ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ

  • ইবনে কুদামা বলেন, হাসান ইবন আবদুল আযীয বর্ণনা করেন, আমি ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি: “আমি ইরাকে এমন কিছু রেখে এসেছি, যার নাম ‘তাগবীর’ (সুফীদের গান)। এটা জিন্দীকরা উদ্ভাবন করেছে, যা দিয়ে তারা মানুষকে কুরআন থেকে ফিরিয়ে রাখে।”[১১]
  • ইবনুল জাওযী বলেন, ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর শিষ্যদের বড় আলেমরা সঙ্গীত/গান (সামা‘) অস্বীকার করেছেন।[১২]
  • ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন: কেউ যদি গান শুনতে অভ্যস্ত হয়, তবে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তার আদল নষ্ট হয়।[১৩]
  • সুফীরা যা ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর নামে বর্ণনা করেছে—যেমন তিনি কবর থেকে বরকত নিতেন বা কবরে গিয়ে দো‘আ করতেন—সব মিথ্যা।
  • যেমন বলা হয় তিনি আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর কবর থেকে তাওয়াসসুল করতেন—এটি মিথ্যা। আলবানী এটিকে দ্বাঈফা (১/৩১)-এ দুর্বল বলেছেন।
  • ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ নিজেই বলেছেন: “আমি অপছন্দ করি, কোনো মাখলুককে এত বড় করা যাতে তার কবর মসজিদ হয়ে যায়।”[১৪]
  • ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর নামে যে উক্তি আনা হয়: “তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে প্রিয় তিনটি: অতিরিক্ত ঝামেলা না করা, মানুষের সাথে কোমল ব্যবহার, আর সুফীদের পথে চলা।”[১৫]—এটি মিথ্যা, এর কোনো সনদ নেই।
  • বরং ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে বলেছেন (তাঁর শিষ্য ইউনুস ইবন আব্দুল আ‘লা থেকে): “যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি সুফীবাদে ঢুকে যোহরের আগেই সে পাগল হয়ে যাবে।”[১৬]
  • আরেক বর্ণনায়: “কেউ যদি চল্লিশ দিন সুফীদের সাথে থাকে, তার বুদ্ধি আর ফিরে আসে না।”[১৭]

৪- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ

  • তাঁর যুগে তাসাওউফ দর্শনমূলক দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু তিনি যখন আত্মশুদ্ধি নিয়ে লিখেছেন, তাঁর গ্রন্থের নাম দিয়েছেন আল-যুহদ, নাম রাখেননি তাসাওউফ।
  • যখন তাঁকে সুফীদের গান (তাগবীর) নিয়ে প্রশ্ন করা হয় যে এটি হৃদয় কোমল করে, তিনি বললেন: “এটি বিদ‘আত।”[১৮]
  • আবার তাকে বলা হলো: সুফীদের কাসিদা নিয়ে কী বলবেন? তিনি বললেন: “বিদ‘আত, তাদের সাথে বসা যাবে না।”[১৯]
  • তাঁর শিক্ষক ইয়াযীদ ইবন হারুন বলতেন: “তাগবীর তো কেবল ফাসিকরা করে। কবে থেকে তাগবীর চালু হলো?”[২০]
  • ইমাম আহমাদকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, সুফীদের মনের ওপর আসা বিশেষ অবস্থা ও হাল-মকাম নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে, তিনি বললেন: “তাদের থেকে বেঁচে থাকো।”[২১]
  • তিনি বললেন: “সাহাবী ও তাবেঈ তো এসব বিষয়ে কথা বলেননি।”[২২]
  • খতীব বাগদাদী বলেন, আহমাদ ইবনে হাম্বল হারিস আল-মুহাসিবীর ‘কালাম’-এর বইগুলো অপছন্দ করতেন এবং লোকদের তাকে থেকে বিরত করতেন।[২৩]
  • আহমদ বলেছিলেন: “হারিস থেকে মানুষকে সতর্ক কর, সে ফিতনার মূল।”[২৪]
  • আবার সুফী সিররি আস-সাকাতীর একটি বানোয়াট কথা শোনানো হলে তিনি বললেন: “তাদের থেকে মানুষকে দূরে সরাও।” এবং আরেক বর্ণনায় বললেন: “এটা কুফর।”[২৫]

সুতরাং এখন সত্য পরিষ্কার হলো, বাতিলের আড়াল সরে গেল। বুঝা গেল যে,

  • ইসলামে যুহদ ও যাহেদ (দুনিয়াবিমুখতা ও দুনিয়াবিমুখী) এর স্থান অনেক উপরে। যার ভিত্তি অবশ‍্যই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নির্ধারিত। যাতে নেই কোনো বিদ‘আত, নেই কোনো বিভ্রান্তি।
  • সূফীবাদ ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় না।
  • সূফীবাদ বিদ‘আত ও বিভ্রান্তি।
  • সূফীবাদ কোনো ইলমী বিষয় না।
  • সূফীবাদ বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শন থেকে আমদানিকৃত।
  • সূফীবাদের সাথে প্রখ‍্যাত চার ইমামের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
  • ইমাম আবু হানিফার সময়ে সূফীবাদের তখনো উত্থান ঘটেনি।
  • ইমাম মালেকের সময় এর কিছু কিছু বিরল কাজ দেখা গিয়েছিল, যা নিয়ে ইমাম মালেক তাদেরকে পাগলের প্রলাপ মনে করে এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
  • ইমাম শাফেয়ীর সময়ে তাদের কিছু কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল কিন্তু ইমাম শাফেয়ী তাদের কঠোর নিন্দা করেন।
  • ইমাম আহমাদের সময় তাদের প্রসার হতে থাকলে ইমাম আহমাদ তাদের থেকে লোকজনকে সাবধান করেছিলেন।
  • সূফীরা তাদের বিদ‘আত, কুফর, শিরক, কুসংস্কার এর পঁচা পণ‍্য চালু করার জন্য সম্মানিত চার ইমামকে নিজেদের দিকে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা করে থাকে।
  1. [১]তারিখে বাগদাদ (১৩/৩৫৪)।
  2. [২]তারিখে বাগদাদ (১০/১২৬)।
  3. [৩]মীযানুল ই‘তিদাল (২/৪৯৬)।
  4. [৪]তারতীবুল মাদারিক (১/১৮০); মানাকিব মালিক আজ-জাওয়াবি, পৃ. ১৫৮।
  5. [৫]আল-মুদাওয়ানা (৪/৪২১)।
  6. [৬]আল-মি‘ইয়ার আল-মু‘আরাব (১১/৩৩)।
  7. [৭]ইবনুল জাওযী, তালবিসু ইবলিস, পৃ. ২৮২।
  8. [৮]তাফসীরে কুরতুবী (১১/২৩৭)।
  9. [৯]ইকাযুল হিমাম (১/৫), আত-তাররুফ ৮।
  10. [১০]আস-সারিমুল মুনকি, পৃ. ২৫৫-২৫৭।
  11. [১১]যমু মা ‘আলাইহিম মুতাসাওউফা, পৃ. ৭।
  12. [১২]তালবিসু ইবলিস, পৃ. ২৮৩।
  13. [১৩]তালবিসু ইবলিস, পৃ. ২৮৩-২৮৪।
  14. [১৪]আল-উম্ম (১/২৭৮)।
  15. [১৫]কাশফুল খিফা (২/৪০৮)।
  16. [১৬]হিলইয়াতুল আওলিয়া (৯/১৫১); তালবিস ইবলিস, পৃ. ৪৪৭।
  17. [১৭]তালবিসু ইবলিস, পৃ. ৪৪৭।
  18. [১৮]মাসাইলুল ইমাম আহমাদ (২/২৭৪)।
  19. [১৯]মাসাইলুল ইমাম আহমাদ (২/২৭৬)।
  20. [২০]সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (৯/৩৫৮), তারিখে বাগদাদ (১৪/৩৩৭)।
  21. [২১]আদাবুশ শারঈয়্যাহ (২/৮২)।
  22. [২২]তাবাকাতুল হানাবিলা (১/১১৩), মানাকিব আহমদ, ২৩২।
  23. [২৩]তারিখে বাগদাদ (৮/২১৪)।
  24. [২৪]তালবিসু ইবলিস, ২০৭।
  25. [২৫]তালবিসু ইবলিস, ২০৯; লিসানুল মীযান (৩/১৮)।
Share on