জাহমিয়াদের একটি মিথ্যা উক্তি
“আল্লাহ ছিলেন, কোনো স্থান ছিল না; আর এখনো তিনি সেই অবস্থাতেই আছেন যেভাবে ছিলেন।”–এই উক্তিটি ভ্রান্ত ও বানানো। এটি নবী ﷺ–এর কথা নয়। এ বিষয়ে কোনো সহীহ, দুর্বল কিংবা জাল হাদীসও বর্ণিত হয়নি এবং সালাফদের কেউ এ কথা বলেননি। বরং পরবর্তী যুগের কিছু জাহমিয়া এ কথা বলেছে। তাদের কেউ কেউ মিথ্যাভাবে এটিকে নবী ﷺ–এর দিকে সম্বন্ধ করেছে।
❖ সহীহভাবে যা বর্ণিত হয়েছে:
সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য গ্রন্থে নবী ﷺ থেকে এসেছে:
«كَانَ اللهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرُهُ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ»
“আল্লাহ ছিলেন, তাঁর আগে কিছুই ছিল না; এবং তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।”[১]
আরেক বর্ণনায়:
“তাঁর সাথে কিছুই ছিল না।”
আরেক বর্ণনায়:
“তিনি ছাড়া কিছুই ছিল না।”
মূলত হাদীসটি যে মজলিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন সেই মজলিস ছিল একটিই, তাই বক্তব্য এক—অন্য বর্ণনাগুলো অর্থের ভিত্তিতে এসেছে। এর মধ্যে প্রথম বর্ণনাটি সবচেয়ে নির্ভুল। এর অর্থ স্পষ্ট: আল্লাহর আগে কোনো সৃষ্ট বস্তু ছিল না। সবই তাঁর সৃষ্টি, তিনি এগুলোকে অনস্তিত্ব থেকে সৃষ্টি করেছেন। নবী ﷺ তাঁর রব সম্পর্কে দোয়ায় বলেছেন:
“আপনি প্রথম, আপনার আগে কিছুই নেই।”
অন্যান্য বর্ণনার অর্থ:
“তাঁর সাথে কিছুই ছিল না” বা “তিনি ছাড়া কিছুই ছিল না”—এর অর্থ এই জগৎ, যা তিনি ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তার কিছুই তখন ছিল না। কারণ হাদীসের মধ্যেই প্রমাণ আছে যে, আল্লাহর কিছু সৃষ্টি আগে থেকেই ছিল—যেমন আরশ ও পানি।
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিউত্তর:
এটি তাদের বক্তব্যকে বাতিল করে দেয়, যারা মনে করে “সৃষ্টির ধরন (نوع المخلوقات)”–এর একটি শুরু রয়েছে (আশআরী-মাতুরিদীরা) এবং এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকারের দিকে যায়। কারণ তারা পরে হওয়ার কারণে গুণগুলোকে “হাদেস” বা নিত্য বলে। আর যেহেতু তাদের নিকট নিত্য যদি অনিত্যের (আল্লাহর) সাথে মিসে তো অনিত্য নিত্য হয়ে যায়, তাই অনিত্য (আল্লাহ) তার অস্তিত্ব হারায়। আস্তাগফিরুল্লাহ। এভাবে গ্রিক দর্শন নিয়ে এসে আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে।
❖ সৃষ্টিজগত সম্পর্কে:
আল্লাহর সৃষ্টির শুরু কোথায়—তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আল্লাহর সৃষ্টি অতীতে শুরুহীন, যেমন ভবিষ্যতে তার শেষ নেই। এটিই আহলুস সুন্নাহর আকীদা-বিশ্বাস।
❖ আল্লাহর অবস্থা:
তিনি সমস্ত সৃষ্টির আগে যেমন ছিলেন, সৃষ্টির পরেও তেমনই আছেন। তিনি নিজ সত্তায় সৃষ্টির ঊর্ধ্বে; উপরে। তাঁর অবস্থান ঊর্ধ্বে, আর তাঁর সমস্ত সৃষ্টি তাঁর নিচে—তিনি তাদের উপরে।
❖ “স্থান” (মাকান) সম্পর্কে আলোচনা:
আল্লাহর ব্যাপারে “স্থান”, “দিক”, “পরিসীমা” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার—নেতিবাচক বা ইতিবাচক—এসব জাহমিয়াদের উদ্ভাবিত কথা, যার মাধ্যমে তারা মানুষকে কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বক্তব্য থেকে সরিয়ে দেয়।
“স্থান” শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে:
- অস্তিত্বশীল স্থান (যা সৃষ্টি): এটি মাখলুক; আল্লাহ এর আগে ছিলেন এবং এর পরেও এর ঊর্ধ্বে আছেন।
- ধারণাগত বা অনস্তিত্বশীল “স্থান”: অর্থাৎ আল্লাহর উচ্চতা—তিনি আরশের উপরে, তাঁর উপরে আর কিছু নেই। এটিকে তারা “স্থান” না বললেও, আমরা ওহীতে যা এসেছে তাই বলি।
সঠিক বক্তব্য কী?
এভাবে বলা যাবে না:
- আল্লাহ কোনো সৃষ্ট স্থানের মধ্যে আছেন, যা তাঁকে ধারণ করে।
- আবার এভাবেও বলা যাবে না: “তিনি কোনো স্থানে নেই”—যেমন জাহমিয়ারা বলে। বরং বলা হবে: তাঁর অবস্থান আরশের উপরে, আসমানে, ঊর্ধ্বে—যেমন দলিলসমূহে এসেছে।
হাদীস ও আছার:
হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
আমার ইজ্জত, আমার মহিমা এবং আমার অবস্থানের উচ্চতার কসম! তারা যতক্ষণ আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাদের ক্ষমা করতে থাকব।[২]
হাসসান ইবন সাবিত (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)–এর কবিতায় এসেছে:
আমাদের ইলাহ আরশের উপরে উচ্চতায় অবস্থিত, আর আল্লাহর স্থান সর্বোচ্চ ও মহান।
❖ আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে প্রমাণসমূহ:
-
তিনি আসমানে—
﴿ءَأَمِنتُم مَّن فِي ٱلسَّمَآءِ… ١٦﴾ [الملك: ١٦]
“তোমরা কি নিরাপদ বোধ করো সেই সত্তা থেকে, যিনি আসমানে আছেন…”[৩]
এবং নবী ﷺ বলেছেন:
«رَبُّنَا اللَّهُ الَّذِي فِي السَّمَاءِ»
“আমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানে তথা উপরে।”[৪]
-
তিনি সৃষ্টির উপরে—
﴿يَخَافُونَ رَبَّهُم مِّن فَوۡقِهِمۡ﴾ [النحل: ٥٠]
“তারা তাদের রবকে ভয় করে, যিনি তাদের উপরে।”[৫]
﴿وَهُوَ ٱلۡقَاهِرُ فَوۡقَ عِبَادِهِ﴾ [الانعام: ١٨]
“তিনি তাঁর বান্দাদের উপরে পরাক্রমশালী”[৬]
নবী ﷺ সা‘দ ইবন মু‘আয (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)–কে বলেছেন:
“তুমি তাদের ব্যাপারে সেই আল্লাহর ফয়সালার মতো ফয়সালা করেছ, যিনি সাত আসমানের উপরে।”যায়নাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন:
“আমাকে আল্লাহ সাত আসমানের উপরে থেকে বিবাহ দিয়েছেন।” -
তিনি ঊর্ধ্বে, উচ্চতায়—
তাঁর নামসমূহের মধ্যে রয়েছে: আল-‘আলী (সর্বোচ্চ), আল-আ‘লা (সর্বোচ্চতম)।
-
তিনি আরশের উপর উঠেছেন —
এটি কুরআনের সাতটি আয়াতে এসেছে।
-
তিনি আসমানের অধিবাসীদের ঊর্ধ্বে—
অর্থাৎ আসমানের উপরে। হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
“যদি সাত আসমান এবং তাদের অধিবাসীরা—আমাকে ছাড়া…”
অর্থাৎ আসমানের বাসিন্দারা আল্লাহ ছাড়া—আর আল্লাহ আসমানে, অর্থাৎ তাদের উপরে। এ কথা পৃথিবী সম্পর্কে বলা হয়নি।
❖ পূর্ববর্তী নবীদের থেকে বর্ণনা:
দাউদ (আলাইহিস সালাম) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন:
হে আসমানের অধিবাসী! আমি তোমার দিকে আমার মাথা উঁচু করেছি। বান্দারা তাদের রবদের দিকে তাকায়, হে আসমানের অধিবাসী![৭]
❖ ইজমা (ঐকমত্য):
১- সমস্ত উম্মাহ একমত যে, আল্লাহ তাআলা ঈসা (আঃ)–কে আসমানে উঠিয়েছেন।
২- এবং মুসলিমদের সাধারণ দোয়ায় যখন তারা বিপদে পড়ে, তখন বলে: “হে আসমানের অধিবাসী!”
(আল-ইবানাহ আন উসূল আদ-দিয়ানাহ, পৃ. ১১৫)