আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ও অন্যান্য মতবাদ
হাফিয ইবনু হাজার আল-আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইসহাক ইবনু রাহাওয়াইহ বলেছেন: “সাদৃশ্য (তাশবীহ) তখনই হবে, যখন বলা হবে— ‘আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মতো’ বা ‘আল্লাহর শ্রবণ মানুষের শ্রবণের মতো’।”
আর তিনি সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ৬৪:
﴿بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ﴾
“বরং তাঁর দুই হাত প্রসারিত; তিনি যেভাবেইচ্ছা ব্যয় করেন।” — এর তাফসির প্রসঙ্গে বলেন:
“ইমামগণ বলেছেন: আমরা এসব হাদীসে (আল্লাহর সিফাত-সংক্রান্ত বর্ণনায়) ঈমান রাখি, কোনো ব্যাখ্যা (কাইফিয়ত নির্ধারণ বা বিকৃত ব্যাখ্যা) ছাড়াই। এ মত পোষণ করেছেন ইমাম সাওরী, ইমাম মালিক, ইবনু উয়াইনা এবং ইবনুল মুবারক।”
ইমাম ইবনু আবদিল বার বলেন:
“আহলুস সুন্নাহ সর্বসম্মতিক্রমে কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত এসব সিফাতকে স্বীকার করেছেন। তারা এগুলোর কোনো কাইফিয়ত (ধরণ-প্রকৃতি) বর্ণনা করেননি। পক্ষান্তরে জাহমিয়্যাহ, মুতাযিলা ও খারিজিরা বলেছে, ‘যে ব্যক্তি এসব সিফাত স্বীকার করবে, সে মুশাব্বিহ (আল্লাহকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্যদানকারী)।’ তখন আহলুস সুন্নাহ তাদেরকে ‘মুআত্তিলা’ (আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারী) বলে অভিহিত করেছেন।” [ফাতহুল বারী, ১৩/৪০৭]
আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে মানুষের মতামত
হাফিয ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “এ বিষয়ে মানুষের বক্তব্যকে মোট ছয়টি মতাদর্শে ভাগ করা যায়।”
প্রথম মত
গুণাবলিকে তার বাহ্যিক অর্থেই গ্রহণ করা। এ মতের অনুসারীরা আবার দুই দলে বিভক্ত:
১ম দল: [আহলুত তামসীল]
তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর গুণাবলি সৃষ্টির গুণাবলিরই অনুরূপ। এরা মূলত মুশাব্বিহাহ (সাদৃশ্যবাদী)। তাদের মধ্যেও বিভিন্ন মত রয়েছে।
- মুশাব্বিহাহ (المشبِّهة)
- হাশিমিয়্যাহ (الهاشمية)
- কাররামিয়্যাহ (الكرامية)
- সালিমিয়্যাহ (السالمية)
২য় দল: [আহলুস সুন্নাহ]
তারা আল্লাহর গুণাবলি থেকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। কারণ—
আল্লাহর সত্তা যেমন কোনো সৃষ্টির সত্তার অনুরূপ নয়, তেমনি তাঁর গুণাবলিও কোনো সৃষ্টির গুণাবলির অনুরূপ নয়।
প্রত্যেক সত্তার এমন গুণ থাকে যা তার নিজস্ব সত্তার উপযোগী। অতএব, আল্লাহর গুণাবলি তাঁর মহান সত্তার উপযোগী এবং প্রকৃত অর্থেই তা সত্য।
এটিই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মত।
[৫. আহলুল হাদীস (أهل الحديث)]
দ্বিতীয় মত
গুণাবলি স্বীকার করা হয়, কিন্তু সেগুলোকে বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করা হয় না। [আসহাবুত তাফওয়ীদ্ব ওয়াত তাওয়ীল]
এ মতেরও দুটি ধারা রয়েছে:
১ম দল. তাফওয়ীযকারীরা (المفوِّضة):
তারা বলে, এ গুণাবলির কোনো নির্দিষ্ট অর্থ আমরা জানি না; বরং এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন।
২য় দল. মু’আওয়্বিলরা (المؤوِّلة): [আসহাবুত তাওয়ীল]
তারা গুণাবলির এমন অর্থ ব্যাখ্যা করে যা বাহ্যিক অর্থ থেকে ভিন্ন। যেমন তারা বলে—
- ইস্তিওয়া (الاستواء) অর্থ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা (الاستيلاء)।
- ইয়াদ (يد) অর্থ ক্ষমতা (القدرة) ইত্যাদি।
[৬. আশায়েরা (الأشاعرة)]
তৃতীয় মত
কোনো গুণকেই আল্লাহর প্রকৃত গুণ হিসেবে নিশ্চিত করা যাবে না। [আহলুত তাজহীল]
তারাও দুটি দলে বিভক্ত:
১ম দল. এগুলো কোনো শব্দ গুণও হতে পারে, তবে এর বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। আবার গুণ নাও হতে পারে। [৭. মাতুরিদী সম্প্রদায় (الماتريدية)]
২য় দল. এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট অর্থ গ্রহণ করা যাবে না; কারণ এতে নাকি তাশবীহ (সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য) অপরিহার্য হয়ে পড়ে। [৮. মু’তাযিলা (المعتزلة)]
তথ্যসূত্র: ফাতহুল বারী, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৪০৮।