আল্লাহ্ নিজ সত্তাসহ আরশের উপর: সালাফে সালেহীনদের এগারোটি ঐকমত্য (ইজমা)
আল্লাহ্ নিজ সত্তাসহ আরশের উপরে আছেন—এ বিষয়ে সালাফে সালেহীন তথা উম্মতের সম্মানিত পূর্বসূরীদের এগারোটি ইজমা তথা সর্বসম্মত মত।
- ইমাম আল-আওযা’ঈ (মৃত্যু: ১৫৭ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “আমরা এবং তাবেঈনরা যখন তখন পর্যাপ্তরূপে জীবিত ছিলাম, আমরা বলতাম — নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আয্যা ওয়াজাল্লা তাঁর আরশের উপরে আছেন এবং আমরা তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে সুন্নাহতে যা এসেছে, তা ঈমানসহ গ্রহণ করি।”
সূত্র: মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৩৭; বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত ও ইবন হাজার, ফাতহুল বারী ১৩/৪১৭। - ইমাম কুতাইবা ইবনু সাঈদ (১৫০–২৪০ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “এটাই ইসলামের ইমামগণ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ-এর মতামত: আমরা আমাদের প্রতিপালককে চিনি — তিনি সপ্তম আসমানের উপরে, তাঁর আরশের উপর রয়েছেন, যেমন তিনি বলেছেন: ﴿الرحمن على العرش استوى﴾।”
আল-যাহাবী বলেন, “এই ইমাম কুতাইবা তাঁর নেতৃত্ব ও সততার মাধ্যমে এই বিষয়ে ‘ইজমা’ (ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন। তিনি মালিক, লাইস, হাম্মাদ ইবনুয যায়েদ প্রমুখ মহৎ ইমামদের সাক্ষাৎ পেয়েছেন।”
সূত্র: মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৮৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তাআরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকল ৬/২৬০; বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ ২/৩৭। - হাদীস বিশারদ ইমাম যাকারিয়া আস-সাজি (মৃত্যু: ৩০৭ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “সুন্নাহর যে আকীদাহর ওপর আমি আমাদের আহলুল হাদীসদের (সাথীদের) দেখেছি তা হলো: আল্লাহ্ তাআলা তাঁর আসমানে, আরশের উপরে আছেন; তিনি যেভাবে চান, সেভাবে তাঁর সৃষ্টির নিকটে আসেন।”
আল-যাহাবী বলেন, “আস-সাজি ছিলেন বসরার শায়খ ও হাফিজ; তাঁর থেকেই আবুল হাসান আল-আশআরি হাদীস ও আহলুস সুন্নাহর আকীদাহ শিখেছিলেন।”
সূত্র: মুখতাসারুল উলু পৃ. ২২৩; ইজতিমাউল জুয়ূশিল ইসলামিয়্যাহ পৃ. ২৪৫। - ইমাম ইবনু বাত্তা আল-‘উকবারি (৩০৪–৩৮৭ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “সাহাবা, তাবেঈন এবং সকল ঈমানদার আলেমগণের সর্বসম্মত মত হলো: আল্লাহ্ তাআলা তাঁর আসমানের উপর, তাঁর আরশের উপর রয়েছেন, সৃষ্টির থেকে পৃথক, আর তাঁর জ্ঞান সমস্ত সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে। এর বিরোধিতা করে কেবল সেই সব লোক, যারা হুলুলিয়্যাহর (আল্লাহ সর্বত্র মিশে আছেন বলে বিশ্বাস করে) পথ অবলম্বন করেছে — যাদের হৃদয় বিপথগামী হয়েছে।”
সূত্র: আল ইবানাহ ৩/১৩৬; যাহাবী, মুখতাসারু উলু পৃ. ২৫২। - ইমাম আবু উমর আত-তালামানকি আল-আন্দালুসি (৩৩৯–৪২৯ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “আহলুস সুন্নাহর মুসলিমগণ সর্বসম্মত যে, ﴿وهو معكم أين ما كنتم﴾ (তিনি তোমাদের সাথে আছেন) — এর অর্থ হলো তাঁর ‘জ্ঞানের অধীন’ এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সত্তাসহ আসমানের উপরে, আর তাঁর আরশের উপর যেভাবে ইচ্ছা তেমনভাবে অবস্থান করেছেন।
তাঁরা বলেন: ﴿الرحمن على العرش استوى﴾ — এর অর্থ ‘আল্লাহ্ সত্যিকারভাবে আরশের উপর উপরে উঠেছেন’, কোনো রূপক অর্থে নয়।”
সূত্র: ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তাআরুদ্ব ৬/২৫০; মাজমূ ফাতাওয়া ৫/১৮৯; বায়ানু তালবীসিল জামিয়্যাহ, ২/৩৮; যাহাবী, মুখতাসারুল উলু, পৃ. ২৬৪। - শায়খুল ইসলাম আবু উসমান আস-সাবুনী (৩৭২–৪৪৯ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “আহলুল হাদীস বিশ্বাস করে এবং সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ সাত আসমানের উপরে, তাঁর আরশের উপর আছেন — যেমন তাঁর কিতাবে বলা হয়েছে। উম্মাহর আলেমগণ ও সালাফগণের ইমামগণ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেননি।”
সূত্র: মুখতাসারুল উলু ও সিয়ারু আলামিন নুবালা। - ইমাম আবু নাসর আস-সাযজী (মৃত্যু: ৪৪৪ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “আমাদের ইমামগণ — সুফিয়ান আস-সাওরি, মালিক, সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ, হাম্মাদ ইবনু সালামাহ, আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ প্রমুখ — সকলেই একমত যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজ সত্তাসহ আরশের উপরে আছেন; তাঁর জ্ঞান সর্বত্র; কিয়ামতের দিনে তিনি আরশের উপর থেকে দৃষ্টিগোচর হবেন।”
সূত্র: ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তাআরুদ্ব ৬/২৫০; যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৭/৬৫৬। - হাফিজ আবু নু‘আইম (৩৩৬–৪৩০ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “আমাদের পথ হলো সালাফদের পথ — যারা কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা অনুসরণ করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন: আল্লাহ্ সর্বদা তাঁর সকল গুণসহ পরিপূর্ণ, পরিবর্তনশীল নন। আর কুরআনে যেসব হাদীস এসেছে ‘আরশ ও আল্লাহর তাতে উঠা’ সম্পর্কে — তাঁরা তা বিনা ধরণ নির্ধারণ ও বিনা তুলনার সাথে গ্রহণ করেন। তাঁরা বলেন: আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক, সৃষ্টিও তাঁর থেকে পৃথক; তিনি তাঁদের মধ্যে প্রবেশ করেন না, একীভূতও হন না; বরং তিনি তাঁর আকাশে, আর তাঁর আরশের উপর অবস্থান করছেন।”
সূত্র: ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তাআরুদ্ব ৬/২৬১; যাহাবী, মাজমূ’ ফাতাওয়া ৫/১৯০; যাহাবী, মুখতাসারুল উলু, ২৬১। - ইমাম আবু যুর‘আ আর-রাযি (২৬৪ হিজরি) ও ইমাম আবু হাতিম (২৭৭ হিজরি)
ইবনু আবি হাতিম বলেন, “আমি আমার পিতা (আবু হাতিম) ও আবু যুর‘আকে আহলুস সুন্নাহর আকীদাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম… তাঁরা বললেন: আমরা সব দেশের আলেমদের দেখেছি — হিজাজ, ইরাক, শাম, ইয়ামান— তাঁদের মাযহাব ছিলো: ঈমান হলো কথা ও কাজ, বৃদ্ধি ও হ্রাস পায় এবং আল্লাহ্ আয্যা ওয়াজাল্লা তাঁর আরশের উপর রয়েছেন, সৃষ্টির থেকে পৃথক, যেমন তিনি নিজেই কুরআনে বলেছেন এবং রাসূল ﷺ তাঁর ভাষায় বলেছেন; কোনো ‘ধরণ’ (কেমন) তা নির্ধারণ ছাড়া।”
সূত্র: ইমাম লালাকাঈ, শারহু উসূলি ই’তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ, ১/১৯৭–২০৪। - ইমাম ইবনু আবদিল বার (মৃত্যু: ৪৬৩ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “হাদীসে ‘নুযূল’ (আল্লাহ্র নেমে আসা) সম্পর্কে যা এসেছে, তা এই দিকের প্রমাণ যে, আল্লাহ্ আয্যা ওয়াজাল্লা আকাশে, তাঁর আরশের উপর, সাত আসমানের উপরে রয়েছেন — যেমন আহলুস সুন্নাহর জামা‘আহ বলে থাকে। এটাই তাদের যুক্তি মুতাযিলা ও জাহমিয়ার বিপরীতে, যারা বলে: আল্লাহ সর্বত্র আছেন এবং আরশের উপর নন।”
তিনি আরও বলেন, “তাওহীদে বিশ্বাসীরা — আরব ও অ-আরব — যখন বিপদে পড়ে, তারা আকাশের দিকে মুখ তুলে সাহায্য চায়। এটি এতই সুপরিচিত বিষয় যে, একে প্রমাণের প্রয়োজন নেই; কারণ এটি মানুষের স্বভাবজাত অন্তর্দৃষ্টি।”
সূত্র: আত তামহীদ, ফাতহুল বার্র বি তারতীবিত তামহীদ ২/৭–৪৮। - ইমাম ইবনু খুযাযইমা (মৃত্যু: ৩১১ হিজরি)
তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি বলে না যে আল্লাহ্ তাঁর আসমানের উপরে, তাঁর আরশের উপর আছেন এবং সৃষ্টির থেকে পৃথক — তাকে তওবা করানো হবে; যদি সে তওবা না করে, তার গলা কেটে ফেলা হবে এবং তাকে আবর্জনার স্তূপে ফেলা হবে, যাতে তার দুর্গন্ধে মুসলিম বা অমুসলিম কেউ কষ্ট না পায়।”
আল-যাহাবী বলেন, “তিনি ছিলেন হাফিজ, ফকীহ, শায়খুল ইসলাম, ইমামুল আইম্মাহ।
তিনি আরও বলেন: ‘যে ব্যক্তি স্বীকার করে না যে আল্লাহ্ আরশের উপর, সাত আসমানের উপরে উচ্চাসনে আছেন — সে কাফির, তার রক্ত বৈধ।’”
সূত্র: ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তাআরুদ্ব ৬/২৬৪; যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৪/৩৬৫।
অতিরিক্ত দলিলসমূহ
আশআরীদের বিভ্রান্তি
-
আশআরীরা দাবি করে যে, সালাফরা “بذاته” (নিজ সত্তাসহ) বলেননি। তারা বলে, “আল্লাহ আরশের উপরে” মানে “মর্যাদা ও স্থানগত উচ্চতা”, সত্তাগত নয়।
কিন্তু শুনো—- ইমাম ইবনু আবি শাইবাহ (মৃত্যু: ২৯৭ হিজরি) বলেছেন:
“বহু বর্ণনা এসেছে যে, আল্লাহ্ তাআলা আরশ সৃষ্টি করেছেন, তারপর নিজ সত্তাসহ (بذاته) তার উপর উচ্চাসনে আরাহণ করেছেন; তিনি আকাশমণ্ডল ও আরশের উপরে রয়েছেন তাঁর সত্তাসহ।”
সূত্র: ইবনু আবি শাইবা, কিতাবুল আরশ। - ইবনু আবি যাইদ আল-কাইরাওয়ানি (মৃত্যু: ৩৮৬ হিজরি) বলেছেন:
“আল্লাহ্ এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তুলনা নেই, সন্তান নেই, স্ত্রী নেই, সঙ্গী নেই; এবং তিনি তাঁর মহিমান্বিত আরশের উপরে রয়েছেন নিজ সত্তাসহ (بذاته)।”
সূত্র: মুকাদ্দামাতুর রিসালাহ, আকীদাতুস সালাফ।
- ইমাম ইবনু আবি শাইবাহ (মৃত্যু: ২৯৭ হিজরি) বলেছেন:
- আশআরীরা মিথ্যা আরোপ করে বলে থাকেন যে, ইমাম ইবনু জারীর আত-তাবারী নাকি তাদের মতো বিশ্বাস করতেন! কিন্তু বাস্তবে, ইমাম তাবারী স্পষ্টভাবে বলেছেন—“وهو على عرشه فوق سمواته السبع” — “তিনি তাঁর আরশের উপর, সাত আসমানের উপরে।” এবং তাঁর ব্যাখ্যায়ও বলেন, “তিনি তাঁদের ‘জানেন’ — তাঁর জ্ঞানের দ্বারা, অথচ তিনি তাঁর আরশের উপর আছেন।” “তিনি আরশের উপরে আছেন, আর তাঁর জ্ঞানের পরিধি তাঁদের সাথে সর্বত্র।”
সূত্র: তাফসীর তাবারী, সূরা আল হাদীদ, তাফসীর আয়াত ৪; সূরা আল মুজাদালাহ ৭; সূরা আয-যুখরুফ ৮৪।
সারসংক্ষেপ:
সালাফে সালেহীন, মুজতাহিদ ইমাম, হাদীস বিশারদ ও আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত আকীদাহ হলো,
- আল্লাহ্ তাআলানিজ সত্তাসহ (بذاته) সাত আসমানের উপরে, তাঁর আরশের উপর অবস্থান করেছেন।
- তাঁর জ্ঞানের পরিধিতে সব জায়গা রয়েছে।
- তিনি সৃষ্টির থেকে পৃথক।
তথ্যসূত্র: ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত।