আশ‘আরিরা কি আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত?
যে ব্যক্তি আশ‘আরিদের অবস্থা এবং তাদের আকীদা সম্পর্কে অবগত, তার জন্য এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে নিশ্চিত হবে—আশ‘আরিরা বিদআতী এবং তারা আহলুস সুন্নাহ নয়। কারণ তারা আকীদার একাধিক মৌলিক বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর বিরোধিতা করেছে। শুধু একটি মূলনীতিতে নয়; বরং বহু মূলনীতিতে তারা বিরোধিতা করেছে।
আহলুস সুন্নাহর কাছে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি যে, কোনো ব্যক্তি যদি আহলুস সুন্নাহর কোনো একটি মূলনীতি—অর্থাৎ সামগ্রিক ও মৌলিক কোনো বিষয়ে—তাদের বিরোধিতা করে, তাহলে তাকে বিদআতী বলা হয়। সেখানে আশ‘আরিরা যখন বহু মৌলিক ও সামগ্রিক বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর বিরোধিতা করেছে, তখন তাদের ব্যাপারে কীভাবে এর চেয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়?
১- এর মধ্যে একটি বিষয় হলো, আশ‘আরিরা বলে যে আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের মতে, ঈমান হলো অন্তরের সত্যায়ন; আর তাদের একটি মত অনুযায়ী ঈমান হলো জ্ঞান। এই উভয় মতই আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বক্তব্য হিসাবে বর্ণিত।
২- এছাড়াও আশ‘আরিরা জবরের আকীদা পোষণ করে, যেটিকে তারা মিথ্যাভাবে ও অন্যায়ভাবে ‘কসবের আকীদা’ নামে অভিহিত করে। অথচ এর প্রকৃত অর্থ হলো—বান্দা বাধ্য; তার নিজের কোনো কার্যক্ষমতা বা ইচ্ছা নেই।
৩- আরও একটি বিষয় হলো, আশ‘আরিদের একটি গোষ্ঠী শুধু কাওনিয়্যাহ ইরাদা বা সৃষ্টিগত/সর্বজনীন ইচ্ছা স্বীকার করে; তারা শর‘ঈ ইরাদা স্বীকার করে না।
৪- এছাড়াও আশ‘আরিরা সিফাতুল মা‘আনী-এর অধিকাংশই অস্বীকার করে। তারা এর মধ্যে মাত্র সাতটি বা আটটি সিফাত স্বীকার করে—এ বিষয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে।
আর তারা যেসব সিফাতুল মা‘আনী স্বীকার করে, সেগুলোও আহলুস সুন্নাহর পদ্ধতিতে স্বীকার করে না। তারা এগুলোকে এমন প্রাচীন ও অনাদি সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করে, যার পৃথক পৃথক নতুন করে তা ঘটে না।
৫- এছাড়াও তারা যেসব সিফাত স্বীকার করে, সেগুলো আহলুস সুন্নাহ যে দলিলের মাধ্যমে সাব্যস্ত করে, সেই দলিলের ওপর নির্ভর করে না। আহলুস সুন্নাহ এসব সিফাত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফের ইজমা—অর্থাৎ সাম‘ঈ দলিল—গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে আশ‘আরিরা সিফাত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির ওপর নির্ভর করে।
৬- আশ‘আরিদের ভ্রান্ত আকীদার আরেকটি দিক হলো, তারা বলে: আল্লাহকে কোনো দিক ছাড়াই দেখা যাবে। তাদের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ হলো—আল্লাহকে দেখা যাবে না। শাইখুল ইসলাম তাঁর আত-তিস‘ঈনিয়্যাহ গ্রন্থে যে বক্তব্য ফখরুদ্দীন আর-রাযীর কাছ থেকে উদ্ধৃত করেছেন, রাযী নিজেই সেখানে এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
৭- এছাড়াও তারা বলে, আল্লাহর কালাম নাফসী, লাফযী নয়। তাদের এ বক্তব্যের অবধারিত অর্থ হলো—আমরা যে কুরআন পড়ি, তা আল্লাহর কালাম নয়। শাইখুল ইসলাম তাঁর আত-তিস‘ঈনিয়্যাহ গ্রন্থে রাযীর বক্তব্য থেকে এটিও উদ্ধৃত করেছেন যে, এ বিষয়টি রাযী স্বীকার করেছেন।
৮- এছাড়াও কারামতের ক্ষেত্রে আশ‘আরিরা সাধারণ বান্দাদের কারামতকে নবী-রাসূলদের মু‘জিযার মতোই মনে করে—তবে কুরআন এর ব্যতিক্রম। এটি তাদের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ মত।
৯- তাদের মধ্যে এ মতও রয়েছে যে, আকীদার ক্ষেত্রে তাকলিদ করা সহীহ নয় এবং যে ব্যক্তি আকীদায় তাকলিদ করবে, সে কাফির। আবার তাদের অন্য একটি মত হলো, তাকে কাফির বলা হবে না; তবে সে গুনাহগার হবে।
১০- তাদের অধিকাংশের মত হচ্ছে, তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ মুক্তির জন্য যথেষ্ট। এ দিক দিয়ে তারা তাওহীদই বুঝেনি।
১১- তাদের অধিকাংশই আমলী শির্ককে শির্ক মনে করে না। এ দিক থেকে তারা শির্কই বুঝেনি।
এ ছাড়াও আকীদার ক্ষেত্রে তাদের আরও বহু ভ্রান্তি রয়েছে।
অতএব যখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তাদের ভ্রান্তি অনেক, তখন এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তারা আহলুস সুন্নাহ নয়। বরং প্রকৃতপক্ষে তারা মু‘তাযিলা ও জাহমিয়্যাদের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। মুতাজিলাদের সাথে আশআরীদের পার্থক্য মূলত শব্দগত; বাস্তবিক অর্থে নয়।
সুতরাং বিষয়টি যখন পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন এসব আশ‘আরির দ্বারা প্রতারিত হওয়া উচিত নয় যে, তারা আহলুস সুন্নাহ। বরং তারা আহলুল বিদআত ও গোমরাহির অনুসারী।
একটি সন্দেহের অপনোদন:
কেউ হয়ত বলতে পারেন, তাহলে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) কেন তাদের ‘আহলুস সুন্নাহ’ বলেছেন?
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) তাঁর মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থে এবং মাজমূ‘উল ফাতাওয়া-তেও আশ‘আরিদের আহলুস সুন্নাহ বলেছেন। এর অর্থ হলো সাধারণ অর্থে। অর্থাৎ তিনি এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রচলিত পরিভাষা বিবেচনা করেছেন।
সাধারণ মানুষ দীনে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকদের সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করে—
রাফিদী অথবা আহলুস সুন্নাহ।
এই ব্যাপক ও সাধারণ অর্থে এমনকি মু‘তাযিলারাও ‘আহলুস সুন্নাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
এটি হলো সাধারণ অর্থে ‘আহলুস সুন্নাহ’ বলা।
কিন্তু শর‘ঈ বা পরিভাষাগত অর্থে তারা আহলুস সুন্নাহ নয়।
কিছু আলেমের বক্তব্যে আমি বিস্মিত:
আমি কিছু আলেমের বক্তব্যে বিস্মিত হয়েছি। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:
“আশ‘আরিদের কী আহলুস সুন্নাহ বলা যায়?”
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
“তারা যেসব বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে একমত, সেসব বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহ।”
এ বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে। কারণ এর অবধারিত ফল হলো বলতে হবে:
“মু‘তাযিলারাও যেসব বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে একমত, সেসব বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহ।”
এক আলেমকে জিজ্ঞেস করা হলো, আশআরীদের পথভ্রষ্ট বলা যাবে কী না?
জবাবে তিনি বললেন, তাদের কিছু ভুল আছে, কিন্তু পথভ্রষ্ট বলা যাবে না।
এ উত্তর কোনোভাবেই ইলমী উত্তর না। আর কোন বিষয়ে ভুল করলে তাদের পথভ্রষ্ট বলা হবে সেটাই প্রশ্ন। ঈমানে ভুল, তাওহীদে ভুল, শির্কের ধারণায় ভুল, মুরজিয়াতে পতিত হওয়ার ভুল।
এত ভুলের পরও পথভ্রষ্ট বলা যাবে না?!
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
আউযু বিল্লাহি মিনাল হাওরি বা’দাল কাউর।
আল্লাহর কাছে আমাদের ও আপনাদেরকে যাবতীয় ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি যেন আমাদের উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দেন এবং যে জ্ঞান তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, তার মাধ্যমে আমাদের উপকৃত করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
রাব্বানা লা তুযিগ কুলূবানা বা’দা মা হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিন লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।
আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।