bn বাংলা
বাংলা বাংলা
English English
عربي عربي


+8801575-547999
সকাল ৯টা হতে রাত ১০টা
Community Welfare Initiative

প্রিয় নবী ﷺ এর দুনিয়ার জগতে আগমন

প্রিয় ভাইসকল,
নবী ﷺ এর মাধ্যমে হিদায়াতের নূর উদ্ভাসিত হয়েছিল, ফজরের আলো উদিত হয়েছিল, অন্ধকার তিরোহিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী এবং আদমকুল সেরা ব্যক্তিত্ব, তিনিই তো আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ ﷺ।

তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ। আল্লাহ প্রদত্ত রহমত ও অর্পিত নিয়ামত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ مَنَّ ٱللّٰهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤﴾ [آل عمران: ١٦٤]

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। যদিও এর আগে তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে ছিল।” [সূরা আলে ইমরান: ১৬৪]

তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ—যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ মুমিনদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেছেন, মুসলিমদের হৃদয়কে পবিত্র করেছেন এবং তাঁকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত ও সকল সৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সর্বদা তাঁর ওপর আল্লাহর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।

তাঁর প্রেরণ ছিল একটি বিজয়ের সূচনা, তাঁর নবুওয়াতের দাওয়াত ছিল এক নতুন ভোর। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে পথভ্রষ্টদের হিদায়াত দিয়েছেন, অজ্ঞদের জ্ঞান দিয়েছেন, বিপথগামীদের সঠিক পথ দেখিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ অন্ধ চোখ খুলে দিয়েছেন, বধির কানকে শ্রবণশক্তি দিয়েছেন এবং আবৃত হৃদয়কে উন্মুক্ত করেছেন। তাঁর মাধ্যমে স্বল্পতাকে প্রাচুর্যে এবং অপমানকে সম্মানে পরিণত করেছেন।

তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ—রহমানের খলীল এবং সমগ্র মানবজাতির নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁর আনুগত্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য পূর্ণ হয় না। আল্লাহ বলেন,

﴿مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللّٰهَۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظٗا ٨٠﴾ [النساء: ٨٠]

“যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” [সূরা আন-নিসা: ৮০]

তাঁর প্রতি ভালোবাসা অর্জন না করা পর্যন্ত ঈমান পূর্ণ হয় না। নবী ﷺ বলেছেন,

«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»

“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা এবং সকল মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।” [সহীহ বুখারী: ১৫]

তিনি ﷺ ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী, আমানতের ক্ষেত্রে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য, কথায় সর্বাধিক সত্যবাদী, অন্তরে সর্বাধিক উদার, দানে সর্বাধিক উদারহস্ত, ধৈর্যে সর্বাধিক দৃঢ় এবং ক্ষমার ক্ষেত্রে সর্বাধিক মহান।

তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ—যাঁর বক্ষ আল্লাহ প্রশস্ত করেছেন, যাঁর মর্যাদা উচ্চ করেছেন, যাঁর বোঝা নামিয়ে দিয়েছেন, যাঁর কার্যকে পূর্ণতা দিয়েছেন এবং যাঁর দীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। তাঁর রব তাঁকে পরিত্যাগ করেননি এবং তাঁর প্রতি অসন্তুষ্টও হননি। বরং তাঁকে পথহীন অবস্থায় পেয়ে হিদায়াত দিয়েছেন, অভাবী অবস্থায় পেয়ে অভাবমুক্ত করেছেন এবং এতিম অবস্থায় পেয়ে আশ্রয় দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে দুনিয়ায় দীর্ঘকাল থাকার অথবা আল্লাহর কাছে যা আছে তা বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন; তিনি আল্লাহর সাক্ষাৎকে বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ—পৃথিবীতে পদচারণাকারী মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বপ্রথম যাঁর জন্য সর্বোচ্চ জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করা হবে। নবী ﷺ বলেছেন,
“আমি আদম-সন্তানদের নেতা। আমিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য যমীন বিদীর্ণ হবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”

তিনি ছিলেন সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জলভাষী, সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ বক্তব্যের অধিকারী। আল্লাহ তাঁকে সংক্ষিপ্ত কথায় ব্যাপক অর্থ প্রকাশের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিলেন এবং তাঁকে অনন্য প্রজ্ঞা দান করেছিলেন।
আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে সুন্দর কাউকে দেখিনি; মনে হতো যেন তাঁর চেহারায় সূর্য বিচরণ করছে।”

আর ইসলামের কবি হাসসান ইবনু সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রাসূল ﷺ-এর প্রশংসায় বলেছেন:
“আপনার চেয়ে উত্তম কাউকে আমার চোখ কখনো দেখেনি, আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে কোনো নারী জন্ম দেয়নি। আপনি সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত অবস্থায় সৃষ্টি হয়েছেন….।”

তিনি প্রিয়তম নির্বাচিত ব্যক্তি ও মনোনীত রাসূল ﷺ, যাঁকে আল্লাহ তা‘আলা পাঠিয়েছেন মানুষকে মূর্তিপূজা ও অন্ধকার থেকে তাওহীদ ও ইসলামের দিকে বের করে আনতে এবং মানুষকে পারস্পরিক সংঘাত, বিভেদ ও পাপাচার থেকে ন্যায়বিচার, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির দিকে নিয়ে যেতে।

পরিপূর্ণতার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন,
তাঁর সৌন্দর্যের মাধ্যমে আল্লাহ অন্ধকার দূর করেছেন,
তাঁর সকল গুণই সুন্দর।
তাঁর ও তাঁর পরিবারের ওপর সালাত পাঠ করো।

হে আল্লাহর বান্দাগণ!
রাসূল ﷺ-এর আগমনের পূর্বে আরবরা চরম অজ্ঞতার যুগে বসবাস করত। তারা পশুর মতো পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত, মূর্তির উপাসনা করত, তীরের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করত, মৃত প্রাণী খেত, কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দিত এবং তাদের শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত। অতঃপর আল্লাহ রাতকে বিদীর্ণ হওয়ার, সকালকে উদিত হওয়ার, অন্ধকারকে দূরীভূত হওয়ার এবং আলোকে বিচ্ছুরিত হওয়ার অনুমতি দিলেন। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত রাসূলকে প্রেরণ করলেন—যিনি মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল; সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ ও মানবজাতির সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি।
আল্লাহ বলেন:

﴿لَقَدۡ جَآءَكُمۡ رَسُولٞ مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ عَزِيزٌ عَلَيۡهِ مَا عَنِتُّمۡ حَرِيصٌ عَلَيۡكُم بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ ١٢٨﴾ [التوبة: ١٢٨]

“নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদের যে কষ্ট হয়, তা তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আত-তাওবাহ: ১২৮]

আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের জন্য নির্বাচন করেছেন, মনোনীত করেছেন এবং রিসালাতের জন্য ভালোবেসে তাঁকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর ওপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক—যতদিন বৃষ্টি বর্ষিত হবে, গাছপালা পত্রপল্লবে সুশোভিত হবে এবং রাত ও দিন পরস্পর আবর্তিত হবে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ!
আমাদের ওপর নবী ﷺ-এর অন্যতম মহান অধিকার হলো—তাঁর আনুগত্য করা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা, তাঁর পথ অবলম্বন করা এবং তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।
ফুযাইল ইবনু ইয়াদ রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“কোনো আমল যদি একনিষ্ঠ হয় কিন্তু সঠিক না হয়, তবে তা কবুল হয় না। আবার কোনো আমল সঠিক হয় কিন্তু একনিষ্ঠ না হয়, তবুও তা কবুল হয় না। সঠিক হওয়া হলো—তা সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়া; আর একনিষ্ঠ হওয়া হলো—তা আল্লাহর জন্য হওয়া।”
এরপর তিনি পাঠ করেন: “সুতরাং যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।” [সূরা আল-কাহফ: ১১০]

ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“সুন্নাহ হলো নূহ আলাইহিস সালামের নৌকা। যে তাতে আরোহণ করল, সে নাজাত পেল; আর যে তা থেকে পিছিয়ে রইল, সে ধ্বংস হলো। এই উম্মতের পরবর্তী অংশও ততক্ষণ সংশোধিত হবে না, যতক্ষণ না যে বিষয়ের মাধ্যমে এর প্রথম অংশ সংশোধিত হয়েছিল, তার মাধ্যমেই সংশোধিত হয়।”

আল্লাহ তাঁর মহান কিতাবে বলেন:

﴿… وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللّٰهَۖ إِنَّ ٱللّٰهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٧﴾ [الحشر: ٧]

“রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং তিনি যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।” [সূরা আল-হাশর: ৭]

আর তিনি বলেন:

﴿… فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٦٣﴾ [النور: ٦٣]

“যারা তাঁর আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন সতর্ক থাকে—তাদের ওপর কোনো বিপর্যয় এসে পড়তে পারে অথবা তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে পড়তে পারে।” [সূরা আন-নূর: ৬৩]

আল্লাহ আরও জানিয়েছেন যে হিদায়াত ও সফলতা রাসূল ﷺ-এর আনুগত্যের মধ্যেই রয়েছে:

﴿قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللّٰهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيۡكُم مَّا حُمِّلۡتُمۡۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلۡبَلَٰغُ ٱلۡمُبِينُ ٥٤﴾ [النور: ٥٤]

“বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তাঁর ওপর তাঁর দায়িত্ব এবং তোমাদের ওপর তোমাদের দায়িত্ব। আর যদি তোমরা তাঁর আনুগত্য করো, তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।” [সূরা আন-নূর: ৫৪]

আল্লাহ আরও বলেন:

﴿… فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُواْ ٱلنُّورَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٥٧﴾ [الأعراف: ١٥٧]

“সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সঙ্গে যে নূর অবতীর্ণ হয়েছে তা অনুসরণ করে—তারাই সফল।” [সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৭]

আল্লাহ তাঁর রাসূল ﷺ-এর আদেশ অমান্য করার ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন:

﴿وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللّٰهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللّٰهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا ٣٦﴾ [الأحزاب: ٣٦]

“কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য এমন কোনো সুযোগ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে সে বিষয়ে তাদের নিজেদের কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হয়, সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হয়েছে।” [সূরা আল-আহযাব: ৩৬]

অতএব, একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য হলো নবী ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তার ওপর আমল করা, তার সুন্নাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং তার ওপর অবিচল থাকা। নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত ন্যায়পরায়ণ খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো। তা মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো।”

তিনি ﷺ আরও বলেছেন:
“এটি আমার সুন্নাহ। অতএব যে আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হলো, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।”

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমরা নিজেদেরকে প্রশ্ন করি—কত সুন্নাহর বিরোধিতা করেছি? কত আদেশ অমান্য করেছি? কত সীমা অতিক্রম করেছি? কত সুন্নাহ পরিত্যাগ করেছি? কত নিষিদ্ধ বিষয় করে ফেলেছি? হে আমাদের রব! আমাদের প্রতি দয়া করুন, আমাদের প্রতি দয়া করুন!

নবী ﷺ-এর ওপর আমাদের আরেকটি অধিকার হলো—সদা সর্বদা আমরা তাঁর জীবনচরিত পড়ব, তাঁর জীবন নিয়ে চিন্তা করব এবং তাঁর ঘটনাবলি শুনব। কারণ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আমাদের আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
আল্লাহ বলেন:

﴿لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللّٰهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللّٰهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللّٰهَ كَثِيرٗا ٢١﴾ [الأحزاب: ٢١]

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করে।” [সূরা আল-আহযাব: ২১]

তাঁর জীবন, তাঁর লেনদেন, তাঁর ইবাদত, তাঁর যুদ্ধাভিযান, তাঁর পরিবারের সঙ্গে আচরণ, সাহাবিদের সঙ্গে তাঁর কর্মপদ্ধতি এবং শত্রুদের সঙ্গে তাঁর আচরণ সম্পর্কে পড়ুন। তাঁর দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানুন—তিনি কীভাবে খেতেন, কীভাবে ঘুমাতেন এবং জীবনের প্রতিটি বিষয়ে কীভাবে আচরণ করতেন। কারণ তাঁর জীবনচরিত হৃদয়ের জন্য ওষুধ, বিবেকের সংশোধন এবং আত্মার জন্য আরোগ্য। এটি ছিল কুরআনের বাস্তব প্রয়োগ, বাস্তব ব্যাখ্যা এবং জীবন্ত নমুনা। উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা তাঁর সম্পর্কে এমনই বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ছিলেন চলমান কুরআনের মতো।

নবী ﷺ-এর ওপর আমাদের আরেকটি অধিকার হলো—আমরা তাঁকে সাহায্য করব এবং যারা তাঁকে গালি দেয়, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রচনা করে অথবা তাঁর নূর নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। আমাদের সময়ে এমন লোকের সংখ্যা অনেক—আল্লাহ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না করুন।

মুসলিম নামধারী অনেককে দেখা যায় তারা তাঁকে বাদ দিয়ে আজ অন্য লোকদের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করছে, অন্যদের পিছনে ছুটছে।
আল্লাহ সত্যই বলেছেন:

﴿ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللّٰهِ وَٱلۡمَسِيحَ ٱبۡنَ مَرۡيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُوٓاْ إِلَٰهٗا وَٰحِدٗاۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ سُبۡحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٣١ يُرِيدُونَ أَن يُطۡفِ‍ُٔواْ نُورَ ٱللّٰهِ بِأَفۡوَٰهِهِمۡ وَيَأۡبَى ٱللّٰهُ إِلَّآ أَن يُتِمَّ نُورَهُۥ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٣٢﴾ [التوبة: ٣١-٣٢]

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের এবং মারইয়ামের পুত্র মাসীহকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কেবল এক ইলাহের ইবাদত করতে; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি তাদের শরিক করা বিষয় থেকে পবিত্র। তারা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৩১–৩২]

﴿هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ ٣٣﴾ [التوبة: ٣٣]

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি এটিকে সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৩৩]

প্রিয় মুসলিম ভাই,
নবী ﷺ-এর ওপর আমাদের অন্যতম অধিকার হলো তাঁকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং মর্যাদা প্রদান করা।
আল্লাহ বলেন:

﴿قُلۡ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُكُمۡ وَإِخۡوَٰنُكُمۡ وَأَزۡوَٰجُكُمۡ وَعَشِيرَتُكُمۡ وَأَمۡوَٰلٌ ٱقۡتَرَفۡتُمُوهَا وَتِجَٰرَةٞ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَمَسَٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَآ أَحَبَّ إِلَيۡكُم مِّنَ ٱللّٰهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٖ فِي سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ ٱللّٰهُ بِأَمۡرِهِۦۗ وَٱللّٰهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَٰسِقِينَ ٢٤﴾ [التوبة: ٢٤]

“বলুন, যদি তোমাদের পিতা, সন্তান, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, যে ব্যবসার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা কর এবং যে বাসস্থান তোমরা পছন্দ কর—এসব যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে আসেন। আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।” [সূরা আত-তাওবাহ: ২৪]

নবী ﷺ-এর ভালোবাসা কেবল মুখে বলা কিছু কথা নয়, কোনো দাবিও নয় এবং মসজিদে ঢাক-ঢোল বাজানোও নয়। বরং তাঁর প্রতি ভালোবাসার অর্থ হলো—তাঁর আনুগত্য করা, তাঁকে অনুসরণ করা এবং তাঁর আদেশ ও নিষেধকে সম্মান করা।
আল্লাহ ‘পরীক্ষার আয়াত’-এ বলেন:

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللّٰهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللّٰهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللّٰهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١﴾ [آل عمران: ٣١]

“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান: ৩১]

হে আল্লাহর বান্দাগণ!
নবী ﷺ জন্ম কোন তারিখে হয়েছিল—এ বিষয়ে আলেম ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, রবীউল আউয়ালের দ্বিতীয় তারিখে; কেউ বলেন অষ্টম তারিখে; কেউ নবম তারিখে; কেউ দশম তারিখে; কেউ দ্বাদশ তারিখে; কেউ সপ্তদশ তারিখে এবং কেউ বাইশ তারিখে।

অধিকাংশ গবেষকের মতে, তার ﷺ জন্ম হয়েছিল রবীউল আউয়ালের অষ্টম তারিখ সোমবার। কারণ তারা দেখেছেন যে দ্বাদশ তারিখটি সোমবারের সঙ্গে মিলে না। তবে এ বিষয়ে সবাই একমত যে নবী ﷺ-এর মৃত‍্যু রবীউল আউয়ালের দ্বাদশ তারিখে হয়েছিল।
তাহলে কোনটি নিয়ে আমাদের দুঃখ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত—যে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে সেটি নিয়ে, নাকি যে বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে সেটি নিয়ে? আর কোনটি আঁকড়ে ধরা অধিক উপযুক্ত—মতভেদপূর্ণ বিষয়টি, নাকি সর্বসম্মত বিষয়টি?

প্রিয় ভাইসকল,
সত্য কথা হচ্ছে, নবী ﷺ জন্মদিন ও জন্মসাল জানা গেছে নিশ্চিতভাবে, কিন্তু জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ জানা যায়নি। তবে জানা গেছে মৃত‍্যুর সাল, মাস, দিন ও তারিখ।

প্রিয় ভাইসকল,
নবী ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে ‘মাওলিদ’ অনুষ্ঠান করা বা তা উদযাপন করা তাঁর মর্যাদা কিংবা সম্মান বৃদ্ধি করে না। কারণ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এমনিতেই সর্বোচ্চ শিখরে; তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের নেতা এবং বিশ্বজগতের রবের কাছে সর্বাধিক সম্মানিত সৃষ্টি।
নবী ﷺ-কে তাঁর সোমবারের সাওমের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন: “এটি সেই দিন যেদিন আমার জন্ম হয়েছিল।”

অতএব নবী ﷺ তাঁর জন্মদিনকে বিশেষ কোনো কাজের মাধ্যমে নয়, বরং সারাবছর স্মরণ করা ও তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে আল্লাহর জন‍্য সোমবার সিয়াম রাখার মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করতে শিখিয়েছেন। তাহলে যে পদ্ধতিতে নবী ﷺ সন্তুষ্ট ছিলেন, তা কেন কারও জন্য যথেষ্ট হবে না? কেন আমরা তাঁর জন্মদিনে তিনি যে সুন্নাহ পালন করেছেন—সিয়াম—তা ছেড়ে এমন একটি নতুন প্রথা গ্রহণ করব, যা তিনি করেননি—উদযাপন?

আল্লাহ বলেন:

﴿… أَتَسۡتَبۡدِلُونَ ٱلَّذِي هُوَ أَدۡنَىٰ بِٱلَّذِي هُوَ خَيۡرٌۚ ٱهۡبِطُواْ مِصۡرٗا …٦١﴾ [البقرة: ٦١]

“তোমরা কি যা নিকৃষ্টতর, তা দিয়ে যা উত্তম তা পরিবর্তন করতে চাও?” [সূরা আল-বাকারা: ৬১]

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
“তোমরা অনুসরণ করো, নতুন কিছু উদ্ভাবন করো না; কারণ তোমাদের জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।”

মহান ব্যক্তি ও নেককারদের জন্মদিন উদযাপন এমন একটি রীতি, যা দূর দেশের মুসলিমরা শাম ও মিসরের খ্রিস্টানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। তারা যখন দেখল যে খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম উদযাপন করে, তখন মুসলিমরা তাদের অনুকরণ করল—এই ধারণায় যে এতে নবী ﷺ-এর প্রতি সম্মান প্রকাশ পায়। অথচ তারা ভুলে গেল যে নবী ﷺ তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন, বিশেষত তাদের ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানসমূহে।

পরবর্তীতে বিষয়টি আরও বিস্তৃত হয়। শিয়ারা নবী ﷺ-এর জন্মের পাশাপাশি আলী, হাসান, হুসাইন ও ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম সকলের জন্ম উপলক্ষেও মাওলিদ চালু করে।

বর্তমানে বিষয়টি আরও ব্যাপক হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মিশ্র মাওলিদ অনুষ্ঠান দেখা যায়। এমন মাওলিদও অনুষ্ঠিত হয় যেখানে পাপাচারী ব্যক্তি, গায়ক-বাদক ও অভিনেতাদের ডেকে এনে গান ও সুর পরিবেশন করা হয়—যেমন কিছু মুসলিম দেশের গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাই।

নবী ﷺ বলেছেন:
“সর্বোত্তম প্রজন্ম হলো আমার প্রজন্ম, তারপর যারা তাদের পরবর্তী, তারপর যারা তাদের পরবর্তী।”

তিনি ﷺ আরও বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে যে আমার পরে জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। অতএব তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত ন্যায়পরায়ণ খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো। তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো। আর নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান হও। কারণ প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত, প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।”

উত্তম প্রজন্মের কেউ মীলাদ পালন করেননি, তাহলে তা কেন করবেন? আপনার আবেগকে শরীআত দিয়ে নিয়ন্ত্রন করুন। নবীকে ভালোবাসার শরঈ পদ্ধতি অনুসরণ করি, যাবতীয় বিদআত পরিত্যাগ করি।

সুতরাং আসুন নবীকে আলোবাসি, তাঁর দেওয়া যাবতীয় সংবাদে ঈমান রাখি, তাঁর দেওয়া সকল নির্দেশ মেনে চলি, তাঁর নিষেধকৃত সবকিছু পরিহার করি, তাঁর দেওয়া শরীআত দিয়েই আল্লাহর ইবাদত করি।

Share on