বিদ‘আতের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
বিদ‘আতের পরিচয়
শাব্দিক: বিদ‘আত শব্দের অর্থ হচ্ছে, নতুনত্ব আনয়ন করা।
পারিভাষিক: শরিয়তের পরিভাষায় বিদ‘আত হচ্ছে “দ্বীনের মধ্যে এমন কোনও করা যা শরীআত প্রবর্তনের সাথে সাদৃশ্য রাখে।”
বিদ‘আত দুই প্রকার
-
- অভ্যাস-সংক্রান্ত নতুনত্ব বা বিদ‘আত। যেমন আধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করা। এটি জায়েয, কারণ মূলনীতি হলো অভ্যাসের ক্ষেত্রে সবকিছু মুবাহ (অনুমোদিত); যদি না সেটাকে সরাসরি কেউ আল্লাহর নৈকট্য উদ্দেশ্য নেয়।
-
দ্বীনের মধ্যে নতুনত্ব বা বিদ‘আত। এটি হারাম, কারণ দ্বীনের মূলনীতি হলো তাকলিফ বা শরীয়তের দলিলের উপর নির্ভর করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ»
“যে আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন করে চালু করবে, যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”[১]
অন্য বর্ণনায়,
«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ»
“যে এমন কোনো আমল করবে, যা আমাদের দ্বীনের অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”[২]
দ্বীনের মধ্যে বিদ‘আতের প্রকার
আকীদা ও মতবাদে বিদ‘আত
এটি দুপ্রকার,
- এমনসব আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করা যা কাফির বানিয়ে দেয়। যেমন জাহমিয়া, বাতেনিয়া, নুসাইরীয়া, বুহরা, বাহাইয়্যাহ, কাদিয়ানিয়্যাহ।
- এমনসব আকীদার-বিশ্বাস পোষণ করা যাতে প্রথমেই পথভ্রষ্ট বিবেচিত হয় পরে আকীদার ভ্রষ্টতার বিবেচনায় কাফির কিংবা মুশরিকে পরিণত হয়। যেমন মু‘তাযিলা, খারেজী, রাফেযী ও অন্যান্য পথভ্রষ্ট দলের ভুল বিশ্বাস।
ইবাদতে বিদ‘আত
যেমন আল্লাহর ইবাদতে এমন কাজ করা, যা শরীয়তে নেই।
ইবাদতের মধ্যে বিদ‘আতের প্রকারভেদ
- মূল ইবাদতে বিদ‘আত। যেমন শরীয়তে না থাকা নতুন নামায চালু করা, না থাকা রোযা রাখা, নতুন ঈদ উদযাপন করা (যেমন মাওলিদ/জন্মদিনের ঈদ)।
- ইবাদতে যোগ-বিয়োগ করা বা পরিবর্তন করা।
এটা ছয় ভাবে হতে পারে:
- ইবাদতের প্রজাতির পরিবর্তন করা। যেমন, হরিণ দিয়ে কুরবানী করা।
- ইবাদত পালনের পরিমাণে পরিবর্তন করা। যেমন যোহরের নামাযে ৫ম রাকআত পড়া।
- ইবাদত পালনের ধরনে বিদ‘আত করা। যেমন বৈধ যিকিরকে গানবাজনার মতো সম্মিলিত সুরে পড়া, বা অতিরিক্ত কষ্ট করে এমনভাবে ইবাদত করা, যা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর বাইরে।
- ইবাদতের জন্য বিশেষ সময় নির্ধারণ করা যেমন শা‘বানের ১৫ তারিখের রাত্রি ও দিনে বিশেষভাবে নামায-রোযা করা। যদিও নামায-রোযা মূলত বৈধ, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে শরীয়ত প্রমাণ ছাড়া নির্ধারণ করা বিদ‘আত।
- ইবাদতের জন্য বিশেষ স্থান নির্ধারণ করা। যেমন তাওয়াফের জন্য কোনো কবরকে নির্ধারণ করা। মসজিদ ছাড়া ইতেকাফ করা।
- ইবাদতের কারণে পরিবর্তন সাধন করা। যেমন, তাহাজ্জদ পড়ার জন্য রাসূলের মিরাজের রাতকে কারণ মনে করা।
বিদ‘আতের সূচনা
প্রথম উদ্ভূত বিদ‘আত ছিল:
- কদর অস্বীকার করা
- ইর্জা‘ (পাপী ঈমানদারকেও পূর্ণ ঈমানদার বলা)
- শিয়া মতবাদ
- খারিজিদের ফিতনা
এগুলো ২য় হিজরী শতাব্দীতে প্রকাশ পায়, তখনো সাহাবীগণ জীবিত ছিলেন, এবং তাঁরা এসব বিদ‘আতের বিরোধিতা করেন।
পরে মু‘তাযিলা মতবাদ উদ্ভব হয়। এরপর মুসলিমদের মধ্যে ফিতনা দেখা দেয়, ভিন্ন মত, বিদ‘আত ও কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ে। তারপর তাসাওফ (ভ্রান্ত সুফিবাদ) এবং কবরের উপর নির্মাণের বিদ‘আত ছড়িয়ে পড়ে। সময় যত গড়িয়েছে, বিদ‘আত তত বেড়েছে ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে।
বিদ‘আত ছড়িয়ে পড়ার কারণসমূহ
- দ্বীনের হুকুম-আহকামের অজ্ঞতা।
- নফসের খেয়াল-খুশি অনুসরণ
- মতবাদ, ব্যক্তি ও দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য।
- কাফেরদের অনুকরণ।
রাসূল ﷺ বলেছেন,
যে দীর্ঘ সময় বাঁচবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে।
আরও বলেছেন,
আল্লাহ জ্ঞান মানুষ থেকে একবারে কেড়ে নেন না; বরং আলেমদের মৃত্যু দ্বারা জ্ঞান তুলে নেন। ফলে যখন আলেম থাকবে না, মানুষ মূর্খদেরকে নেতা বানাবে, তারা জিজ্ঞেস করলে অজ্ঞতার সাথে ফাতওয়া দিবে। এতে করে নিজেরাও বিভ্রান্ত হবে, অন্যকেও বিভ্রান্ত করবে।[৩]
তাই বিদ‘আতের মোকাবিলা করতে পারে কেবল ইলম ও আলেমরা। যখন জ্ঞান ও আলেম হারিয়ে যায়, বিদ‘আত ছড়িয়ে পড়ে, বিদ‘আতীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বিদ‘আতের ক্ষতি
- বিদ‘আত হলো কুফরীর পথপ্রদর্শক।
- বিদ‘আত হলো দ্বীনে এমন কিছু যোগ করা, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ শরীয়ত করেননি।
- বিদ‘আত বড় গুনাহ থেকেও খারাপ।
- শয়তান বিদ‘আতে বেশি খুশি হয়, কারণ: পাপী জানে তার কাজ গুনাহ, তাই সে তওবা করতে পারে। কিন্তু বিদ‘আতকারী মনে করে সে ইবাদত করছে, তাই তওবা করে না।
- বিদ‘আত আল্লাহর গজব ও শাস্তি ডেকে আনে।
- বিদ‘আত হৃদয়কে বিভ্রান্ত ও নষ্ট করে।
- বিদ‘আত সুন্নাহ ধ্বংস করে, মানুষকে সুন্নাহ ও আহলে সুন্নাহর প্রতি বিমুখ করে।
আল্লাহ বলেন,
﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۗ أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ﴾
“আর যখন তাদেরকে বলা হয় তোমরা অনুসরণ কর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার, তখন তারা বলে আমরা তো বরং সেটার অনুসরণ করবো যার ওপর আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি। যদি তাদের পিতৃপুরুষরা কোনো কিছু না বুঝা বা হিদায়াতপ্রাপ্ত না হলেও?”[৪]
আজকের দিনেও কিছু বিদ‘আতীরা যেমন মাযারপন্থী, সুফি, কবরপূজারীরা – তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহর দিকে ডাকলে তারা নিজেদের মাযহাব, পীর-মাশায়েখ ও বাপ-দাদার অনুকরণকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করায়।
আধুনিক যুগের বিদ‘আত
- নবীজির জন্মদিন উদযাপন
- স্থান, জিনিস ও মৃত ব্যক্তিদের থেকে বরকত হাসিল করা
- ইবাদতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নতুন নতুন পদ্ধতি চালু করা
- কাফেরদের রীতি-নীতি অনুসরণ।
মোটকথা
- বিদ‘আত হলো দ্বীনের মধ্যে বাড়তি সংযোজন।
- বিদ‘আত মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
- বিদ‘আত আল্লাহর গজব ও শাস্তি নামায়।
- বিদ‘আত আখেরাতে নবীর হাউজ থেকে পান করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।