bn বাংলা
বাংলা বাংলা
English English
عربي عربي


+8801575-547999
সকাল ৯টা হতে রাত ১০টা
Community Welfare Initiative

খিযির (আলাইহিস সালাম): তিনি কি নবী নাকি ওলী? — এবং তাঁর দ্বারা নিহত সেই বালক সম্পর্কে আলেমগণের মতামত

সূফীদের মধ্যে অনেকেই খিযির আলাইহিস সালাম কর্তৃক বালককে হত্যার বিষয়টিকে ওলী কর্তৃক যা ইচ্ছার করার পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে থাকে। তাদের অনেকেই মনে করে থাকে যে, খিযির ওলী ছিল, মূসা নবী ছিলেন, আর ওলীর কাছে এমন জ্ঞান ছিল যা নবীর কাছে ছিল না। বস্তুত এটি মারাত্মক বিভ্রান্তি। কারণ,
এক. খিযির আলাইহিস সালাম নবী ছিলেন এটাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত।
দুই. খিযির আলাইহিস সালাম নবী আর মূসা আলাইহিস সালামও নবী, তাদের মধ্যে ভিন্ন দিক থেকে বিশেষ কোনো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলেও অবশ্যই মূসা আলাইহিস সালামের মর্যাদা বেশি।

এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে খিযির আলাইহিস সালাম কেন বালকটিকে হত্যা করলেন?
উত্তর: খিযির (আলাইহিস সালাম) যে বালককে হত্যা করেছিলেন—সে বালক প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) ছিল নাকি অপ্রাপ্তবয়স্ক—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যারা মনে করেন সে প্রাপ্তবয়স্ক ছিল, তাদের মতে এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ খিযির (আলাইহিস সালাম) তার কুফর সম্পর্কে অবগত ছিলেন, কিন্তু মুসা (আলাইহিস সালাম) তা জানতেন না।

আর যারা বলেন সে তখনো প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি—তাদের মতে, আলেমদের একটি বড় অংশের কাছে বোধসম্পন্ন (মুমাইয়্যিয) শিশুর কুফরও গ্রহণযোগ্য; কিন্তু আমাদের শরিয়তে সে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাকে হত্যা করা হয় না। আর আরবি ভাষায় “غلام (গোলাম)” শব্দটি কখনো প্রাপ্তবয়স্ক যুবককেও বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।[১]

রাযী বলেন:
“জেনে রাখো, ‘গোলাম’ শব্দটি কখনো প্রাপ্তবয়স্ক যুবককেও বোঝায়। প্রমাণ এই যে, বলা হয়: ‘বয়স্কদের মতামত উত্তম, ‘গোলাম’ এর উপস্থিতির চেয়েও’। এখানে ‘শাইখ’ (বয়স্ক) শব্দকে ‘গোলাম’-এর বিপরীতে আনা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, গোলাম মানে যুবক। এর মূল শব্দ ‘ইঘতিলাম’, অর্থাৎ প্রবল যৌন আকাঙ্ক্ষা—আর তা যৌবনেই হয়ে থাকে। তবে এই শব্দটি ছোট শিশুর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়—এ কথাও স্পষ্ট।”

তিনি আরও বলেন, কুরআনে এই বিষয়ে কিছু স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে, তাকে কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল—সে কি শিশুদের সাথে খেলছিল, নাকি একা ছিল? সে মুসলিম ছিল নাকি কাফির? সে কি বিচ্ছিন্ন ছিল? সে প্রাপ্তবয়স্ক ছিল নাকি ছোট?

বস্তুত “গোলাম” শব্দটি ছোট ছেলের জন্য বেশি উপযুক্ত হলেও বড় যুবকের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে। তবে আয়াতে ‘এক প্রাণের পরিবর্তে নয়’ বলাটি (بغير نفس) ছোট শিশুর তুলনায় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ; কারণ ছোট শিশুকে তো হত্যা করা হয় না, এমনকি সে হত্যা করলেও…

তাছাড়া আয়াতের প্রকাশ্য ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, মুসা (আলাইহিস সালাম) মনে করতেন, কেবল কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ) ছাড়া কাউকে হত্যা করা বৈধ নয়। অথচ কখনো রক্ত হালাল হওয়ার অন্য কারণও থাকতে পারে। এর উত্তর হলো: সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হলো কিসাস, তাই তিনি তাতেই আপত্তি করেছিলেন।
— তাফসীরে রাযী, (২১/৪৮৬)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“খিযির যে গোলামকে হত্যা করেছিলেন, কুরআনে কোথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়নি যে সে অবাধ্য শিশু ছিল বা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। তবে সহীহ হাদীসে এসেছে: ‘যে গোলামকে খিযির হত্যা করেছিল, সে জন্ম থেকেই কাফির প্রকৃতির ছিল। যদি সে জীবিত থাকত, তবে সে তার পিতা-মাতাকে অবাধ্যতা ও কুফরের মধ্যে ফেলে দিত।’ এ থেকে বোঝা যায়, সে তখনো পূর্ণ বয়সে পৌঁছেনি। হ্যাঁ, যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েই কুফর করত, তবে সে নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যেত।

আর যদি সেই শরিয়তে বালেগ হওয়ার আগেই তাকে মুকাল্লাফ ধরা হয়ে থাকে, অথবা যারা বলেন, বোধসম্পন্ন শিশু ঈমানের ব্যাপারে মুকাল্লাফ হয়, যেমন আবু হানিফা, আহমদ (রহিমাহুমাল্লাহ) প্রমুখের কিছু অনুসারী বলেন, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তার ওপর ঈমান জরুরি হতে পারে।

আর যদি তাকে তখনো মুকাল্লাফ ধরা না-ও হয়, তবুও অধিকাংশ আলেমের মতে বোধসম্পন্ন শিশুর কুফর সাব্যস্ত হয়। সে যদি মুরতাদ হয়ে যায়, তাহলে সে মুরতাদ হিসেবেই গণ্য হবে— এমনকি যদি তার পিতা-মাতা ঈমানদার হন। আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে তাকে শাস্তিও দেওয়া হবে, সালাত ত্যাগের শাস্তির চেয়েও বেশি, তবে সে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাকে হত্যা করা হবে না—আমাদের শরিয়তে।

তাই খিযর যে গোলামকে হত্যা করেছিলেন, সে হয়তো:
১. প্রাপ্তবয়স্ক কাফির ছিল—তাহলে তাকে হত্যা করা বৈধ,

অথবা
২. বালেগ হওয়ার আগে কাফির হয়েছিল এবং সেই শরিয়তে তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল, যাতে সে তার পিতা-মাতাকে দীন থেকে বিচ্যুত না করে—যেমন আমাদের দীনেও কোনো কাফির শিশু মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করলে এবং তা যদি হত্যা ছাড়া প্রতিহত করা সম্ভব না হয়, তবে তাকে হত্যা করা বৈধ। বরং যে কাফির শিশু মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, তাকেও হত্যা করা হয়। সুতরাং বোধসম্পন্ন কাফির শিশুকে হত্যা করা বৈধ, যদি তার অনিষ্ট অন্যভাবে প্রতিহত করা সম্ভব না হয়।

কিন্তু এমন শিশুকে হত্যা করা, যে এখনো কুফর করেনি অথচ জানা আছে বড় হলে কুফর করবে— এ বিষয়ে দু’টি মত রয়েছে,
এক. এই বিষয়ে কুরআন বা সহীহ সুন্নাহতে সরাসরি কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তাই তাকে হত্যা করা যাবে না।
দুই. কেউ কেউ বলেন, সুন্নাহতে এর ইঙ্গিত আছে। যেমন: যখন নাজদা হারূরী ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করেছিল: ‘বালকদের হত্যা করা যাবে কি?’—তিনি বললেন: ‘তুমি যদি তাদের ব্যাপারে সে জ্ঞান রাখো, যা খিযির ঐ শিশু সম্পর্কে রাখতেন, তাহলে তাকে হত্যা করো; নচেৎ করো না।’[২] তবে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত বিষয়কে কেবল সঠিক ও শক্তিশালী প্রমাণ দ্বারাই বাতিল করা যায়।

আর যারা প্রথম মত গ্রহণ করেছেন তারা বলেন: আল্লাহ তা‘আলা কাউকে সেই কাজের কারণে শাস্তি দেন না, যা সে এখনো করেনি। এমনকি যদি আল্লাহ জানেন যে সে তা ভবিষ্যতে করবে। বরং তা সংঘটিত হওয়ার পরই তিনি শাস্তি দেন।”
— দার’উ তা‘আরুদ্বিল আকলি ওয়ান-নাকলি: (৮/৪২৭)

  1. [১]দেখুন: তাফসিরে কুরতুবী (১১/২১)।
  2. [২]মুসলিম।
Share on