আশ‘আরী-মাতুরিদীদের বক্তব্য খণ্ডন [পর্ব-১]
এই পর্বের আগে একটি ভূমিকা ছিল, যেখানে আমি আশআরীদের অবস্থান ও তাদের দলীল গ্রহণের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি।
➤ আগের ভূমিকাটি পড়তে ক্লিক করুন।
আজ আমাদের প্রথম পর্বের সময়।
হে আমার আশআরী ভাই, আজ আমি তোমার সাথে আল্লাহর নাম ও সিফাত নিয়ে আলোচনা করব না। বরং কিছু সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলব। আমি একটি প্রশ্ন দিয়ে আলোচনা শুরু করছি: “তুমি কি বিশ্বাস কর যে যমীন কথা বলে?”
অবশ্যই তুমি বলবে, না। কারণ সাধারণ বুদ্ধি তা অস্বীকার করে। কিন্তু আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কথা বলেছে:
﴿…قَالَتَآ أَتَيۡنَا طَآئِعِينَ ١١﴾ [فصلت: ١١]
“তারা উভয়ে বলল: আমরা স্বেচ্ছায় উপস্থিত হলাম।” [সূরা ফুসসিলাত: ১১]
তুমি কি বলবে, এটি রূপক (মাজায)? অর্থাৎ যেন তারা বলেছে। কারণ তোমার মতে বাস্তব অর্থে কথা বলা অসম্ভব। কেননা যদি বাস্তব অর্থে কথা বলে, তাহলে তাদের জিহ্বা, কণ্ঠনালী ও কথার যন্ত্র থাকা আবশ্যক হবে। অথচ তা নেই। সুতরাং এটিই নাকি অর্থকে প্রকৃত অর্থ থেকে রূপকের দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ। তাই বলা হবে, “যেন তারা বলেছে”—অর্থাৎ অবস্থা দ্বারা প্রকাশ করেছে, কথার মাধ্যমে নয়।
কিন্তু তোমার কাছে প্রশ্ন:
“আল্লাহ যেমন বলেছেন, তেমনি কেন বলো না যে আসমান-যমীন সত্যিই বলেছে, তবে এমন পদ্ধতিতে যা আমরা জানি না এবং বুঝি না?”
আল্লাহ বলেন:
﴿…وَمَن فِيهِنَّۚ وَإِن مِّن شَيۡءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمۡدِهِۦ وَلَٰكِن لَّا تَفۡقَهُونَ تَسۡبِيحَهُمۡۚ…٤٤﴾ [الإسراء: ٤٤]
“এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে না; কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না।” [সূরা আল-ইসরা: ৪৪]
প্রত্যেক সৃষ্টিরই তাসবীহ করার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। আমরা তা বুঝি না বলে কি তা অস্তিত্বহীন হয়ে যায়?
তাসবীহ তো একটি মৌখিক ইবাদত। এখানে তাসবীহ অর্থ আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করা।
আল্লাহ পাথর সম্পর্কে বলেন:
﴿…وَإِنَّ مِنۡهَا لَمَا يَهۡبِطُ مِنۡ خَشۡيَةِ ٱللَّهِۗ…٧٤﴾ [البقرة: ٧٤]
“আর কিছু পাথর তো আল্লাহর ভয়ে নিচে নেমে পড়ে।” [সূরা আল-বাকারা: ৭৪]
এখানে তিনি পাথরের জন্য খাশিয়াত (ভয়) সাব্যস্ত করেছেন, অথচ তুমি তাদের জন্য কথা বলা সাব্যস্ত করতে চাও না! কিন্তু খাশিয়াত তো অন্তরের ইবাদত। পাথরের কি হৃদয় আছে?
পাথরও আল্লাহর এক সৃষ্টি। আল্লাহর সব সৃষ্টি নিজেদের উপযোগী উপায়ে তাঁর মহিমা ঘোষণা করে।
এখন বলো: পশুপাখি কি কথা বলে?
তুমি বলবে, না। কারণ তাদের মানুষের মতো কথা বলার যন্ত্র নেই। তাহলে নবি সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে পিঁপড়া ও হুদহুদ পাখির কথোপকথনের ব্যাপারে কী বলবে? সেটা তো প্রকৃত অর্থেই ছিল। তবে তাদের ভাষা আমরা বুঝি না। আল্লাহ তাঁর নবী সুলাইমানকে তা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের কথা কি অক্ষর ও শব্দে ছিল? অবশ্যই ছিল। কারণ নবি সুলাইমান তা শুনেছেন এবং বুঝেছেন।
কীভাবে পিঁপড়া ও হুদহুদ কথা বলেছিল আমরা তার ধরন জানি না। আল্লাহ যদি চান, আমাদেরকেও পিঁপড়ার কথা শুনিয়ে দিতে পারেন এবং পাখির ভাষা বুঝিয়ে দিতে পারেন। তিনি তো সর্বশক্তিমান।
আরেকটি প্রশ্ন:
তোমার বুদ্ধি কি মেনে নেয় যে জড়বস্তু নড়াচড়া করে বা সাড়া দেয়?
তাহলে আল্লাহর সেই বাণী সম্পর্কে কী বলবে, যেখানে তিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীন সম্পর্কে বলেছেন যে তারা তাঁর আদেশে স্বেচ্ছায় উপস্থিত হয়েছে?
তোমার সামনে দুটি পথ:
১. আল্লাহকে সত্যবাদী মনে করে বলবে যে তারা শোনে, মানে, প্রত্যাখ্যান করে এবং গ্রহণ করে—তবে এমন পদ্ধতিতে যা আমরা জানি না।
তখন প্রশ্ন হবে: তারা কীভাবে শুনল?
তুমি বলবে: আমি জানি না।
তাদের কি শ্রবণের কোনো যন্ত্র আছে?
আমি জানি না।
তাহলে তারা কীভাবে তাদের রবের কথা শুনল?
আল্লাহ তাদের মধ্যে এমন এক পদ্ধতি সৃষ্টি করেছেন, যা আমরা জানি না।
অথবা,
২. তুমি তোমার সীমাবদ্ধ বুদ্ধিকে বিচারক বানিয়ে বলবে: তারা শুনতে পারে না। ফলে আল্লাহর বাণী তোমার বুদ্ধির সাথে না মেলায় তুমি সেটিকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করবে।
তবে আমার ধারণা, তুমি এমনটি বলবে না।
উপসংহার
আজ আমরা আল্লাহর এমন কিছু সৃষ্টির ব্যাপারে আলোচনা করলাম, যাদের জন্য আল্লাহ তাঁর কিতাবে কিছু গুণ সাব্যস্ত করেছেন—যেমন কথা বলা, শোনা ইত্যাদি। এগুলোর বাস্তবতা ও ধরন আল্লাহই জানেন; আমরা জানি না।
আল্লাহর সৃষ্টিজগতে অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যা আমাদের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। তাই আমাদের জন্য একমাত্র পথ হলো বলা: “আমার রব সত্য বলেছেন, আর আমার বুদ্ধি সীমাবদ্ধ।”
যখন অন্যান্য সৃষ্টির বাস্তবতাই আমাদের বোধগম্যতার বাইরে, তখন আল্লাহর মহান সত্তাকে কীভাবে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব?
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿…وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا ١١٠﴾ [طه: ١١٠]
“তারা তাঁকে জ্ঞান দ্বারা পরিবেষ্টন করতে পারবে না।” [সূরা ত্ব-হা: ১১০]
এটাই ছিল প্রথম পর্ব। আল্লাহ সহজ করলে পরবর্তীতে আরও পর্ব আসবে।
আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের হিদায়াত দান করেন এবং সত্যকে স্পষ্টভাবে দেখার তাওফীক দেন। আমরা সবাই তাঁর ভালোবাসা ও মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যাপারে একমত, এবং এ ব্যাপারেও একমত যে—
﴿…لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١﴾ [الشورى: ١١]
“তাঁর সদৃশ কোনো কিছু নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১]