bn বাংলা
বাংলা বাংলা
English English
عربي عربي


+8801575-547999
সকাল ৯টা হতে রাত ১০টা
Community Welfare Initiative

মাজার ভক্ত গোষ্ঠীর কবরে সিজদাহ দেওয়ার বিভিন্ন সন্দেহের অপনোদন

প্রথমত: আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য সিজদার বিভাজন

কবরপূজারী মাজার ভক্ত গোষ্ঠী বলে, “আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য সিজদা দুই প্রকার: ইবাদতের সিজদা এবং সম্মানসূচক (তাহিয়্যার) সিজদা। কবরপূজাও সম্মানসূচক সিজদার অন্তর্ভুক্ত, ইবাদতের নয়।”

এর জবাব:
হে ভাইয়েরা, এই কথাটাই মূলত ভ্রান্তি। সিজদা নিজেই একটি ইবাদত, যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। নবী ﷺ আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য সব ধরনের সিজদা নিষেধ করেছেন—এমনকি যদি তা শুধু “সম্মান” হিসেবেও করা হয়। যেমনটি ঘটেছিল মুʼআয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু–এর ঘটনায়। নবী ﷺ তাঁকে বলেছিলেন:

«لَا تَفْعَلُوا لَو كنت آمُر أحد أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ النِّسَاءَ أَنْ يَسْجُدْنَ لِأَزْوَاجِهِنَّ»

“এটা করো না। যদি আমি কাউকে কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে স্বামীর জন্য সিজদা করতে আদেশ দিতাম।”[১]

ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্টভাবে বলেন:

আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য সিজদা করা আমাদের শরিয়তে চূড়ান্তভাবে হারাম করা হয়েছে।[২]

অতএব “সম্মানসূচক সিজদা” বললেও হারাম হওয়া বাতিল হয় না।

কবরের সামনে সিজদাকে ‘তাহিয়্যা’ বলে বৈধ করার চেষ্টা—দ্বীনের নামে বিদ‘আতকে বৈধ করার অপচেষ্টা, আর এটাকেই আলেমগণ স্পষ্ট গোমরাহি বলেছেন।

এখানে আরো একটি বিষয় রয়েছে, তা হচ্ছে হারামকে হালাল করা আরেক প্রকার শির্ক।[৩] সুতরাং আমাদের শরীআতে যা হারাম করা হয়েছে তা যদি কেউ হালাল করে তবে সে মুশরিক।

দ্বিতীয়ত: ফেরেশতাদের ও ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের সিজদা দ্বারা দলিল দেওয়া

কবরপূজারী মাজার ভক্ত গোষ্ঠী বলে: “ফেরেশতাদের আদমকে সিজদা এবং ইউসুফের ভাইদের সিজদা ছিল সম্মানসূচক। যদি তা শির্ক হতো, তবে আল্লাহ তা আদেশ দিতেন না।”

এর জবাব:
এটি বাতিল দলিল—কারণ এটি নাসিখ (পরবর্তী বিধান) ছেড়ে মানসুখ (বাতিলকৃত বিধান) দিয়ে দলিল পেশ করা। পূর্ববর্তী শরিয়তগুলোতে সম্মানসূচক সিজদা বৈধ ছিল, কিন্তু ইসলামী শরিয়তে তা সম্পূর্ণরূপে রহিত (নাসখ) করা হয়েছে।

ইমাম কুরতুবী বলেন:

পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে সম্মানসূচক সিজদা বৈধ ছিল, এরপর এই উম্মতের জন্য তা রহিত করা হয়েছে।

অতএব যে ব্যক্তি ফেরেশতা বা ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনার মাধ্যমে কবরের সামনে সিজদাকে বৈধ করতে চায়, সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করছে এবং শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিলের বিরোধিতা করছে। তাছাড়াও পূর্ববর্তী শরীআতের বিধানকে আমাদের শরীআতে রহিত করার পর সেটা চালু করা সুস্পষ্ট বড় শির্ক ও বড় কুফর। সে হিসাবেও এ ধরনের সিজদাহ তাহিয়্যাহ চালু করা শির্ক।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:

এরা আগের বিধান ও আমাদের দীনের বিধানের মধ্যে গুলিয়ে ফেলে। অথচ প্রমাণ কেবল সেই শরিয়ত থেকেই গ্রহণযোগ্য, যা মুহাম্মাদ ﷺ–এর উপর নাযিল হয়েছে।

তৃতীয়ত: মুআয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু–এর হাদিস

কবরপূজারী মাজার ভক্ত গোষ্ঠী বলে, “নবী ﷺ মুআযকে কাফির বলেননি, শুধু উপদেশ দিয়েছেন।”

এর জবাব:
এ কথা ঠিক যে নবী ﷺ তাঁকে কাফির বলেননি, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কাজটি হালাল বা নিছক সম্মান ছিল। কাজটি হারাম। উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে এটি ছোট বা বড় শির্কের মাধ্যম হতে পারে।

ইবনুল কাইয়্যিম বলেন:

উপায় বা মাধ্যমের বিধান উদ্দেশ্যের বিধানেরই অনুরূপ; যে মাধ্যম আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতের দিকে নিয়ে যায়, তা হারাম।

অতএব “নবী ﷺ তাকে কাফির বলেননি” বলে বিষয়টি হালকা করা—শরিয়তের উপর মিথ্যা আরোপ এবং বড় হারামকে তুচ্ছ করে দেখানো। তাছাড়া ইসলামের নীতি হচ্ছে কাউকে নির্ধারণ করে কাফির বলার আগে তার উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা ও সন্দেহ দূর করতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করেছেন। নিষেধ করা ও বুঝিয়ে দেওয়ার পর যদি আবার করতেন তাহলে তিনি মুশরিক ও কাফির হয়ে যেতেন, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

চতুর্থত: কবরের সামনে সাধারণ মানুষের সিজদা

কবরপূজারী মাজার ভক্ত গোষ্ঠী বলে, “কিছু অজ্ঞ মানুষ নেককারদের কবরের সামনে সিজদা করে—এটি ইবাদত নয়, বরং সম্মান ও অতিরিক্ত ভালোবাসার ফল।”

এর জবাব:
এটি ভয়াবহ গোমরাহি। কবরের সামনে সিজদা করা বড় ধরনের গুনাহ। নবী ﷺ বলেছেন:

«لَعَنَ اللهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسْجِدًا»

“আল্লাহ ইয়াহূদি ও খ্রিষ্টানদের অভিশাপ দিয়েছেন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছে।”[৪]

সুতরাং কবরের সামনে সিজদা কেবল ভালোবাসা নয়; এটি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নৈকট্য লাভের চেষ্টা, যা স্পষ্ট শির্ক। এখানে কবরপূজারীদের কথা “অতিরিক্ত ভালোবাসা”র অজুহাতে বিদ‘আত ও শির্ককে বৈধ করার চেষ্টা করছে—এটি দীনের বিকৃতি।

পঞ্চমত: যাহাবী ও গাযালীর বক্তব্য দ্বারা দলিল দেওয়া

কবরপূজারী মাজার ভক্ত গোষ্ঠী বলে, “ইমাম যাহাবী কবরের প্রতি অতিরিক্ত টানকে ‘অতিরিক্ত ভালোবাসা’ বলেছেন, আর গাযালী বলেছেন—তাকফীর না করায় ভুল করা, রক্তপাতের চেয়ে হালকা।”

এর জবাব:
ইমাম যাহাবী কখনোই কবরের সামনে সিজদাকে বৈধ বলেননি। আর ইমাম গাযালীর কথা ছিল তাকফীরের বিষয়ে—বিদ‘আতী শির্ককে ধুয়ে-মুছে বৈধ করার বিষয়ে নয়।

আহলুস সুন্নাহ বলেন:
মন্দ কাজ থেকে সতর্ক করতে হবে, দোষীকে হিকমাহ ও কোমলতার সাথে শিক্ষা দিতে হবে—কিন্তু শির্ককে বৈধ করা বা তাতে শিথিলতা দেখানো জায়েয নয়।
অতএব “নরম আচরণ”-এর নামে দীনের বিকৃতি ঢাকার চেষ্টা চরম গোমরাহি।

ষষ্ঠত: মানুষের কর্মকান্ড দিয়ে দলীল দেওয়ার অযথা চেষ্টা

কবরপূজারী মাজার ভক্ত গোষ্ঠী বলে, “যুগ যুগ ধরে কবরের সামনে এগুলো হয়ে আসছে, তাই এগুলো নিয়ে কথা না বললেও হবে।” এ হচ্ছে কবরপূজারীদের শেষ চেষ্টা। ডুবে যাওয়া মানুষ যেমন খড়-কুটুর অবলম্বন ধরে শেষ চেষ্টা করে যায় এরাও এটা নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর উত্তর আলহামদুলিল্লাহ অনেক সহজ—

  1. উম্মতের মধ্যে এসব বিশ্বাস ও কর্ম খাইরুল কুরূন বা রাসূল, সাহাবী, তাবেঈদের যুগে ছিল না। এগুলো পরবর্তি আকীদা বিভ্রান্ত লোকদের তৈরি।
  2. যখনই এমন কিছুর উদ্ভব হয়েছে তখনই আলেম-উলামা ও সত্যনিষ্ঠ লোকেরা সেটার বিরোধিতা করেছে।
  3. দলীল হয় কুরআন, সুন্নাহ ও আছারে সালাফিল উম্মাহ, সালাফ পরবর্তী লোকদের কর্মকান্ড দলীল হলে দীন তার স্বকীয়তা হারাবে এবং ভুলুন্ঠিত হবে।
  4. যুগে যুগে কাফিররা নবীদের বিরুদ্ধে এমন কুযুক্তিই তুলে ধরতো। বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে তারা আল্লাহর নবীদের আনীত শিক্ষাকে অবজ্ঞা-অবহেলা করতো।

হে ঈমান ও ইসলামের ভাইয়েরা!
আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য সিজদা মোটেই বৈধ নয়। “সম্মান” ও “ইবাদত” বলে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। কবরের সামনে সিজদাকে “শুধু সম্মান” বা “ভালোবাসা” বলা শরিয়তের বিকৃতি এবং স্পষ্ট বিদ‘আত। যে ব্যক্তি এমন কথা বলে, সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং কুরআন, সুন্নাহ ও আহলুল ইলমের ইজমার বিরোধিতা করে। যে কোনো মুসলিম, যে সত্য চায়, তার এ বিষয়টি ভালোভাবে জানা আবশ্যক।

  1. [১]তিরমিযি, আলবানী সহীহ বলেছেন।
  2. [২]মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া।
  3. [৩]সূরা আল আনআম ১২১।
  4. [৪]বুখারী: ১৩৩০, মুসলিম: ৫২৯।
Share on