আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)–এর বিবাহসংক্রান্ত হাদীস নিয়ে উত্থাপিত ভ্রান্তির জবাব
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী, তাঁর পরিবার, সাহাবী এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসরণকারীদের ওপর।
প্রাচ্যবিদদের দ্বারা বিচ্যুত কিছু মস্তিষ্ক পরাজিত মানসিকতা নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সম্মান রক্ষার নামে এ দাবি করেন যে, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)–এর বিবাহের বয়স সংক্রান্ত হাদীসটি “দুর্বল”। আবার কেউ কেউ বলেন—এটি মাওকুফ (নবীর কথা নয়), এর বর্ণনা ত্রুটিপূর্ণ, ইতিহাস ও স্বাভাবিকতার (ফিতরাত) বিরোধী।
এই ভ্রান্ত দাবিগুলো খণ্ডনের আগে দুটি মৌলিক নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—
প্রথম নীতি:
রাসূল ﷺ সকল দোষ-ত্রুটি, অপূর্ণতা ও নিকৃষ্ট বিষয় থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁর থেকে এমন কিছু সংঘটিত হওয়া অসম্ভব, যা সুস্থ ফিতরাতের বিরোধী।
দ্বিতীয় নীতি:
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে যা এসেছে—তা মূলত সহীহ এবং নির্ভরযোগ্য। উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে এ বিষয়ে।
ইমামুল হারামাইন বলেন:
কেউ যদি শপথ করে যে সহীহাইন-এর হাদীসগুলো সহীহ—তবে সে শপথ ভঙ্গ করবে না; কারণ মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত।
হ্যাঁ, অল্প কিছু হাদীস নিয়ে মুহাদ্দিসগণ আলোচনা করেছেন—কিন্তু তা মূলত উচ্চতর মানের সহীহের স্তর নিয়ে, মূল সহীহত্ব নিয়ে নয়। এখন মূল সন্দেহের জবাবের দিকে যাচ্ছি,
এই সন্দেহের উৎপত্তি
এই সন্দেহ নতুন নয়। এটি মূলত হাদীস অস্বীকারকারী তথাকথিত “কুরআনী”দের কাছ থেকে এসেছে। ১৯৩৪ সালে ভারতে এক ব্যক্তি প্রথম এ নিয়ে আপত্তি তোলে। পরে পাকিস্তানে গুলাম জিলানী বারক নামের ব্যক্তি এ হাদীস অস্বীকার করে। এরপর বিভিন্ন আধুনিক লেখক ও চিন্তাবিদ এ মত প্রচার করেন।
এমনকি আধুনিক কালের কিছু লেখকও এই বিষয়ে ভিত্তিহীন মত দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা আগের গবেষণাই কপি করে নিজেদের নামে চালিয়ে দেন।
হাদীসের সনদ ও প্রমাণ
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
রাসূল ﷺ আমাকে ছয় বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং নয় বছর বয়সে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন।
এই হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ বহু গ্রন্থে এসেছে। বহু শক্তিশালী সনদে এটি বর্ণিত হয়েছে। এটি একাধিক ইমাম ও নির্ভরযোগ্য রাবীর মাধ্যমে এসেছে।
সুতরাং এটি কোনো একক বা দুর্বল বর্ণনা নয়। এছাড়া একই বিষয় অন্য সাহাবীর মাধ্যমেও এসেছে—যা এটিকে আরও শক্তিশালী করে।
“মাওকুফ” দাবির জবাব
যাদের দাবি যে হাদীসটি “মাওকুফ”—এটি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, এটি নবীর কাজ (বিয়ে)—এবং নবীর কাজ সম্পর্কিত বর্ণনা সরাসরি “মারফু” (নবীর সাথে সম্পর্কিত) হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।
“মতনের ত্রুটি” দাবির জবাব
হাদীসের মতন (বর্ণনার বিষয়বস্তু) তখনই দুর্বল বলা হয়, যখন তা কুরআন বা শক্তিশালী হাদীসের বিরোধী হয়। কিন্তু এখানে তা হয়নি। বরং এই হাদীসের পক্ষে বহু প্রমাণ রয়েছে, যেমন:
- আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) খেলনা নিয়ে খেলতেন।
- তিনি অল্পবয়সী ছিলেন—এমন সাক্ষ্যও এসেছে।
ইতিহাস দিয়ে হাদীস খণ্ডনের ভুল পদ্ধতি
কোনো কোনো পরাজিত মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি “ঐতিহাসিক তথ্য” নাম দিয়ে উপরোক্ত সহীহ হাদীসটি খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। যেমন: আয়েশা ও আসমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)–এর বয়সের পার্থক্য। কিন্তু এসব তথ্য দুর্বল বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে হাদীস এসেছে শক্তিশালী সনদে। তাই ইতিহাসের অনুমানভিত্তিক তথ্য দিয়ে সহীহ হাদীস বাতিল করা সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি।
“ফিতরাতের বিরোধী” দাবির জবাব
এ দাবিও সঠিক নয়। কারণ, বিয়ের বয়স সময় ও সমাজভেদে ভিন্ন হয়। প্রাচীন আরব সমাজে অল্প বয়সে বিয়ে স্বাভাবিক ছিল এবং কেউ তা অস্বাভাবিক মনে করত না।
সহীহ বুখারী ও মুসলিম নিয়ে সন্দেহের জবাব
কোনো কোনো বিচ্যুত পথের পথিক দাবি করেছেন—সহীহাইন-এ দুর্বল হাদীস আছে। এটি একটি বিপজ্জনক দাবি। উলামায়ে কেরাম কিছু সীমিত হাদীস নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু তা কখনো পুরো গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
উপসংহার
সব আলোচনা শেষে স্পষ্ট হয়—
- আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে সংক্রান্ত সহীহ হাদীসটির বিরুদ্ধে এসব দাবি গবেষণাভিত্তিক নয়।
- এগুলো দুর্বল যুক্তি ও ভুল পদ্ধতির ওপর দাঁড়ানো।
- এগুলো মূলত পূর্ববর্তী কোনও কোনও ফিতনাবাজদের সন্দেহগুলোর পুনরাবৃত্তি।
সত্য গ্রহণ করতে হলে সহীহ হাদীস ও উলামায়ে কেরামের পদ্ধতি অনুসরণ করাই সঠিক পথ।
আল্লাহই সহায়ক।