আকীদাগত কিছু বিষয় যেখানে আশ‘আরিরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন
১. আল্লাহ কোথায়?
প্রশ্ন: আল্লাহ তাঁর কিতাবে সাত জায়গায় বলেছেন— “আর-রাহমান আরশের উপর উঠেছেন”—তাহলে আপনারা কীভাবে বলেন যে আল্লাহকে স্থান বা দিক দ্বারা বর্ণনা করা যায় না?
উত্তর: আল্লাহ নিজে নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন আমরা তাই সাব্যস্ত করি—অর্থাৎ আরশের উপর তাঁর উঠা, যা তাঁর মর্যাদার উপযোগী; কীভাবে—তা নির্ধারণ না করে এবং কোনো সাদৃশ্য স্থাপন না করে। অথচ আশ‘আরিরা তাশবীহের আশঙ্কায় (তাদের দাবিমতে) দিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উচ্চতাকে অস্বীকার করে—যা কুরআন, সুন্নাহ ও মানুষের স্বভাবগত বোধের স্পষ্ট বিরোধী।
২. সিফাতকে (বুদ্ধিবৃত্তিক) ও (খবরভিত্তিক) ভাগ করা
প্রশ্ন: সিফাতকে এমনভাবে ভাগ করার শর’ঈ দলীল কী—কিছু সিফাত নাকি আক্কল দ্বারা জানা যায় (যেমন তারা যে সাতটি সিফাত মানে), আর কিছু সিফাত আক্বল দ্বারা প্রমাণিত নয় বলে সেগুলোতে তাওয়ীল করা হবে?
উত্তর: এ ধরনের বিভাজন বিদ‘আত। সব সিফাতই ওহির উপর নির্ভরশীল। আক্বল আল্লাহর উপর হুকুম চালায় না; বরং ওহি যা এনেছে তা সত্যায়ন করে। ‘শোনা’ (যা তারা মানে) আর ‘হাত’ (যা তারা তাওয়ীল করে)—এ দুটির মধ্যে পার্থক্য করা স্ববিরোধিতা; কারণ উভয়ই একই শরঈ নসসে এসেছে।
৩. সিফাতের তা’ওয়ীল (মাজাজে নেওয়া)
প্রশ্ন: আপনারা কেন ‘হাত’কে ক্ষমতা বা নিয়ামত বলেন, আর ‘চেহারা’কে সওয়াব বলে তা’ওয়ীল করেন—যখন কথার মূলনীতি হলো হাকীকত (প্রকৃত অর্থ), মাজাজ নয়?
উত্তর: দলীল ছাড়া তা’ওয়ীল করা তাহরীফ বা বিকৃতি। যদি ‘হাত’ দ্বারা ‘ক্ষমতা’ই উদ্দেশ্য হতো, তবে আল্লাহর বাণী “আমি তাকে আমার দুই হাতে সৃষ্টি করেছি”—এ কথায় আদমের কোনো বিশেষত্ব থাকত না; কারণ ইবলিস ও সব সৃষ্টিই তো আল্লাহর ক্ষমতায় সৃষ্টি।
৪. আল্লাহর কালাম (শব্দগত ও নফসী)
প্রশ্ন: আমরা যে কুরআন মুসহাফে পড়ি—তা কি প্রকৃত অর্থে আল্লাহর কালাম, নাকি আল্লাহর কালামের কেবল “হিকায়াত/প্রকাশ”?
উত্তর: আশ‘আরিরা বলেন—আসল কালাম নফসী; আর উচ্চারিত শব্দ মাখলূক। কিন্তু সত্য হলো—কুরআন আল্লাহর কালাম, অমাখলূক; এর শব্দ ও অর্থ—সবই। আল্লাহ তা শব্দ ও হরফসহ বলেছেন, যা তাঁর কাছ থেকে শোনা হয়েছে।
৫. ‘হুসন ও কুবহ’ (ভালো-মন্দ) প্রসঙ্গ
প্রশ্ন: কোনো কাজ কি নিজগতভাবে ভালো বা মন্দ, নাকি কেবল আদেশ-নিষেধের কারণেই তা ভালো-মন্দ?
উত্তর: আশ‘আরিরা বলেন—শরঈ আদেশ-নিষেধ ছাড়া ভালো-মন্দ নেই। সঠিক কথা হলো—নিশ্চয়ই আক্বল ন্যায়ের ভালোত্ব ও জুলুমের মন্দত্ব উপলব্ধি করে; তবে সওয়াব ও শাস্তি নির্ধারিত হয় কেবল শরীয়তের মাধ্যমে।
৬. ঈমান (কথা ও আমল)
প্রশ্ন: আপনারা কেন আমলকে ঈমানের অংশ থেকে বের করে দিয়ে ঈমানকে কেবল ‘তাসদীক’ (অন্তরের স্বীকৃতি) বানান?
উত্তর: এতে ইরজার পথে চলে যাওয়া হয়। যা কখনো সঠিক নয়। আহলুস সুন্নাহর মতে ঈমান—জিহ্বার কথা, অন্তরের বিশ্বাস ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল; তা আনুগত্যে বাড়ে এবং গুনাহে কমে।
৭. আকীদায় খবরে আহাদ
প্রশ্ন: আকীদার বিষয়ে কেন আপনারা খবরে আহাদ (অল্প বর্ণনাকারীর সহীহ হাদীস) গ্রহণ করেন না?
উত্তর: এ বিভাজন বাতিল। সাহাবারা নবী ﷺ–এর সংবাদ সব বিষয়ে গ্রহণ করতেন। দীন অবিভাজ্য। সত্যবাদীর সংবাদ ইলম (জ্ঞান) ও আমল—উভয়ই প্রমাণ করে।
৮. আখিরাতে আল্লাহর দর্শন
প্রশ্ন: আপনারা আখিরাতে আল্লাহর দর্শন মানেন, কিন্তু বলেন—“সরাসরি দেখা নয়, কোনো দিক ছাড়াই”—তাহলে দিক ছাড়া কিছু কীভাবে দেখা যায়?
উত্তর: এটি বুদ্ধিবৃত্তিক স্ববিরোধিতা। আল্লাহর দর্শন কুরআনের স্পষ্ট নস বা ভাষ্যে প্রমাণিত—“তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে”। মানুষের দর্শনের জন্য দৃশ্যমান সত্তা দর্শকের বিপরীত দিকে থাকা আবশ্যক; তা অস্বীকার করলে প্রকৃত দর্শনই অস্বীকার করা হয়।
৯. ‘ইস্তেওয়া’ সম্পর্কে বক্তব্য
প্রশ্ন: কেন আপনারা ‘ইস্তেওয়া’কে ‘ইস্তাওলা’ (দখল/কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা) বলে ব্যাখ্যা করেন—যখন দখল তো প্রতিযোগিতা ও প্রতিরোধের পরেই হয়?
উত্তর: এটি জাহমিয়া ও মুতাযিলাদের ব্যাখ্যা—ভাষাগত ও শরঈ—উভয় দিক থেকেই বাতিল। আল্লাহ চিরকালই সর্বশক্তিমান; আরশে উঠার আগেও আরশ তাঁর মালিকানায় ছিল এবং পরেও। সালাফরা ‘ইস্তেওয়া’ ব্যাখ্যা করেছেন—উচ্চে উঠেছেন/উর্ধ্বে গিয়েছেন/উপরে উঠেছেন/উপরে অবস্থান নিয়েছেন—অর্থে।
১০. আক্বল না নকল—কোনটি অগ্রাধিকার?
প্রশ্ন: যদি আক্বল ও নকল (ওহি)–এর মধ্যে সংঘর্ষ মনে হয়—কোনটি অগ্রাধিকার পাবে?
উত্তর: আশ‘আরিরা আক্বল (কুল্লী আইন)কে অগ্রাধিকার দেন। সঠিক কথা হলো—সহীহ নকল কখনোই সুস্পষ্ট আক্বলের বিরোধী নয়। কোথাও বিরোধ মনে হলে নকলই অগ্রাধিকার পাবে; কারণ আক্বলের পরিধি সীমাবদ্ধ ও ভুলপ্রবণ।
টীকা: এই প্রশ্নগুলোর উদ্দেশ্য হলো—শর’ঈ নস বা ভাষ্যের সাথে আচরণে সালাফি পদ্ধতি ও মুতাকাল্লিমদের (কালামবিদদের) পদ্ধতির মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট করা।