রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পথই একমাত্র সরল পথ—বাকি সব ভ্রষ্টতা
কোনো পথ নেই, একাধিক পথও নেই—শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পথই একমাত্র পথ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওপর যা নাযিল হয়েছে, কেবল সেটিই ইসলাম। আর এর বাইরে যা কিছু আছে, তা ভ্রষ্টতা। তাই প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য হলো—তার আকীদা ও আমল যেন আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সহীহ সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করা, এবং বিদ‘আত থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।
শয়তানের অনেকগুলো পথ আছে। কিন্তু আল্লাহর পথ একটাই।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
“আর এ পথই আমার সরল পথ। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এভাবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।”[১]
ভ্রষ্টতার উদাহরণসমূহ
১. মাজার ও কবর পূজা
রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরের উপর নির্মাণকাজ নিষেধ করেছেন। জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
রাসূলুল্লাহ ﷺ কবর গাঢ় রঙ করা, এর উপর বসা, এবং এর উপর নির্মাণ করার থেকে নিষেধ করেছেন।
২. কবরওয়ালা মসজিদে সালাত পড়া
এটি জায়েয নয়। নবী ﷺ বলেছেন,
আল্লাহ ইয়াহূদী ও নাসারাদের অভিসম্পাত করুন, তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছে।
এবং বলেছেন,
তোমাদের আগে যারা ছিল, তারা তাদের নবী ও সৎকর্মশীলদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছিল। তোমরা কবরকে মসজিদ বানিও না। আমি তোমাদের তা থেকে নিষেধ করছি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন,
আমার কবরকে উৎসবস্থল কোরো না।
৩. আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর জন্য অলী বা দরবেশকে ডাকা বা তাদের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া।
এটি শিরক। কারণ, এটি কুরাইশ কাফেরদের কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ۚ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ﴾
“জেনে রাখো, আল্লাহর জন্যই খাঁটি দ্বীন। আর যারা তাঁর বাইরে অন্য অভিভাবক নিয়েছে, তারা বলে: আমরা তাদের কেবল এজন্যই উপাসনা করি যাতে তারা আমাদেরকে আল্লাহর কাছে আরও ঘনিষ্ঠ করে দেয়।”[২]
৪. নতুন নতুন যিকির বানানো বা নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময়, নিয়ম নির্ধারণ করা এবং তা কোনো ‘পীর’ এর নামে চালু করা।
এগুলো বিদ‘আত। ইবাদতের মূলনীতি হলো ‘তাওকীফ’ (অর্থাৎ কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নির্ধারণ করেছেন, শুধু তাই বৈধ)।
৫. দাবি করা যে রাসূল ﷺ দুনিয়ার জীবনের মতো জীবিত আছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ﴾
“অবশ্যই আপনি (হে মুহাম্মদ ﷺ) মরবেন এবং তারাও মরবে।”[৩]
৬. “হাযিরা/হুজুরি” নামক নাচ-গান-ঢোলসহ দলবদ্ধ যিকির।
এটি বিদ‘আত। কারণ, আল্লাহর বিধান ছাড়া কোনো উপায়ে তাঁর ইবাদত বৈধ নয়। ‘আয়িশাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ»
“যে আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন করে চালু করবে, যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”[৪]
৭. রাসূল ﷺ এর অতিরিক্ত প্রশংসা ও গুলু (অতিরঞ্জন)।
নবী ﷺ বলেছেন,
আমাকে এমনভাবে প্রশংসা করো না যেভাবে নাসারারা ঈসা ইবন মারইয়ামকে করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। তাই বলো: আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।[৫]
৮. দলে দলে বিভক্ত হওয়া।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ ۚ وَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ﴾
“আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভক্ত হলো ও মতবিরোধে লিপ্ত হলো। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।”[৬]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا ۖ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ﴾
“যারা তাদের দীনকে টুকরো টুকরো করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে—প্রতিটি দলই তাদের নিজেদের কাছে যা আছে তাতেই আনন্দিত।”[৭]
৯. যারা কোনো ‘পীরের তরিকা’ অনুসরণ করে
মনে রেখো, আল্লাহর আদেশ হলো কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ কে অনুসরণ করা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾
“বলুন (হে মুহাম্মদ ﷺ): যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন।”[৮]
মুসলিমরা কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসারী—অপর কারো নয়।
ইসলামের মূল উদ্দেশ্য
ইসলাম এসেছে এসব বিদ‘আত, শিরক ও ভ্রষ্ট পথ ধ্বংস করতে। ইসলাম আপনাকে সহজভাবে বলে দিয়েছে: আল্লাহর কাছে পৌঁছতে তোমার কোনো অলী, পীর, বা মধ্যস্থতাকারীর দরকার নেই। তুমি কি আল্লাহর কাছে ঘনিষ্ঠ হতে চাও? খুবই সহজ:
﴿وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ﴾
“সেজদা করো এবং নৈকট্য লাভ করো।”[৯]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ﴾
“আমার বান্দারা যখন আমার ব্যাপারে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, তখন (বলুন): আমি তো (সাড়া দেওয়ার জন্য) নিকটেই আছি। যে আমাকে ডাকে, আমি তার দো‘আ কবুল করি। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে—হয়তো তারা সঠিক পথে চলবে।”[১০]
লক্ষ্য করুন: কুরআনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে “قُلْ” (বলুন) এসেছে, যেমন:
﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْيَتَامَى قُلْ إِصْلَاحٌ لَّهُمْ خَيْرٌ﴾
কিন্তু উপরে আল্লাহকে ঢাকার আয়াতে সরাসরি ﴿فَإِنِّي قَرِيبٌ﴾ এসেছে—“বলুন” শব্দটি নেই। এটি এ কারণেই যে, এমনকি রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও বান্দা ও রবের মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারী নন।
সতর্ক হও, আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন। দীনের পথ একটাই—রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পথ। এর বাইরে সব কিছুই বিদ‘আত ও ভ্রষ্টতা।
- [১]সূরা আল-আন‘আম, আয়াত নং ১৫৩।
- [২]সূরা আয-যুমার, আয়াত নং ৩।
- [৩]সূরা আয-যুমার, আয়াত নং ৩০।
- [৪]সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম: ১৭১৮; সুনানে আবূ দাউদ: ৪৬০৬।
- [৫]সহীহ বুখারী।
- [৬]সূরা আলে-ইমরান, আয়াত নং ১০৫।
- [৭]সূরা আর-রূম, আয়াত নং ৩২।
- [৮]সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৩১।
- [৯]সূরা আল-আলাক, আয়াত নং ১৯।
- [১০]সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত নং ১৮৬।