দুনিয়া আখিরাতের ক্ষেত
জীবন হচ্ছে আখিরাতের জন্য কর্মের সময়কাল। এই জীবনের সময়ই এমন এক সুযোগ যেখানে স্থায়ী সুখ বা চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এটি হলো পাথেয় সংগ্রহের পথ, মুক্তি ও সফলতার সিঁড়ি। যে ব্যক্তি জানে এই অল্প সময়ই স্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামের মূল চাবিকাঠি—সে অবশ্যই এর মূল্য বুঝে নেয়। আর যে বুঝে না, সে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত, আর আখিরাতে হবে চরম অনুতপ্তদের একজন।
ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
যে জানে এই অল্প সময়ের জীবন চিরস্থায়ী জান্নাতে পৌঁছার সফরের পুঁজি, সে একে নষ্ট করে না।[১]
তিনি আরেক জায়গায় বলেন,
মানুষের উচিত সময়ের মর্যাদা ও মূল্য বুঝা, যেন একটি মুহূর্তও আল্লাহর নৈকট্য ছাড়া ব্যয় না হয়।[২]
কারো কারো বাণী:
যদি তোমার মূলধনই হয় সময়, তবে তা ব্যয় করো শুধু প্রয়োজনীয় বিষয়ে।
ইমাম ইবন কুদামা আল-মাকদিসী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
“হে আল্লাহর বান্দা! তোমার মূল্যবান জীবনকে কাজে লাগাও, তোমার সময়ের যত্ন নাও, মনে রেখো—তোমার আয়ু সীমিত, নিশ্বাসগুলো গোনাযোগ্য। প্রতিটি নিশ্বাস তোমার জীবন থেকে কিছুটা অংশ কমিয়ে দেয়। পুরো জীবন সংক্ষিপ্ত, আর তারও যে অংশ বাকি সেটাই সবচেয়ে কম। প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি বহুমূল্য রত্ন—যার কোনো তুলনা নেই, কোনো বিকল্প নেই। এই স্বল্প জীবনের বিনিময়েই নির্ধারিত হবে চিরস্থায়ী জান্নাত বা চিরস্থায়ী জাহান্নাম। এই জীবন চিরস্থায়ী জীবনের তুলনায় এমন, যেন একটি মুহূর্ত এক হাজার হাজার বছর সুখের সমান হতে পারে, বা বিপরীত। এই জীবনের তাই অমূল্য মূল্য। তাই নিজের সময় অপচয় করো না, সেগুলো বিনিময়হীন চলে গেলে হতাশ হবে, এমন কাজ করো না যাতে কোনো প্রতিদান নেই। চেষ্টা করো, তোমার প্রতিটি নিশ্বাস যেন আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর নৈকট্যের কোনো কাজে ব্যয় হয়। তোমার যদি একটি মূল্যবান হীরা হারিয়ে যায়, তুমি দুঃখ পেতে—তবে কিভাবে সময় নষ্ট করো? সময় চলে গেলে কি তোমার দুঃখ হবে না?”[৩]
কে সফল, কে ব্যর্থ?
সফল সেই ব্যক্তি যে বুঝে নিয়েছে—এই দুনিয়া একটি পরীক্ষার স্থান, এবং এখানেই আখিরাতের জন্য পাথেয় জমা করতে হয়। সে পরিশ্রম করে, যাতে তার মালিক তার থেকে সেই আমল গ্রহণ করেন এবং তাকে জান্নাতের বিনিময়ে সেই আমল কিনে নেন। আর ব্যর্থ সেই ব্যক্তি যে গাফেলতায় জীবন পার করে দিয়েছে, সুযোগ হাতছাড়া করেছে, নেয়ামত অপচয় করেছে, সময় নষ্ট করেছে, দুনিয়ার রঙিনতায় মগ্ন থেকেছে। যখন মৃত্যু এসে উপস্থিত হলো, তখন সে খালি হাতে ফিরে এলো। তখন অনুতাপ করে কিন্তু আর ফিরতে পারবে না।
আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেন,
﴿فَإِن يَصۡبِرُواْ فَٱلنَّارُ مَثۡوࣰ ى لَّهُمۡۖ وَإِن يَسۡتَعۡتِبُواْ فَمَا هُم مِّنَ ٱلۡمُعۡتَبِينَ ٢٤﴾ [فصلت: ٢٤]
“তারা ধৈর্য ধরলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস, আর তারা ক্ষমা চাইলে তাও কবুল হবে না।”[৪]
নবী (ﷺ) এর উপদেশ – সুযোগের সদ্ব্যবহার করো
রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি আসার আগে কাজে লাগাও:
• তোমার যৌবন বার্ধক্যের আগে,
• সুস্থতা অসুস্থতার আগে,
• সম্পদ দারিদ্র্যের আগে,
• অবসর ব্যস্ততার আগে,
• জীবন মৃত্যুর আগে।
তাই, তুমি যতদিন জীবিত, করো সৎ কাজ, কারণ মৃত্যু এসে গেলে কাজ করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
আহলে দুনিয়ার অবস্থা – ইমাম ইবন কুদামা রাহিমাহুল্লাহর পেশকৃত একটি উপমা
তিনি বলেন, দুনিয়াবাসীর অবস্থা এমন:
একদল লোক এক জাহাজে উঠে সমুদ্রে যাত্রা করে। ঝড়ে তাদের জাহাজ এক দ্বীপে গিয়ে লাগে। সে দ্বীপে ছিল অমূল্য রত্ন, হীরা, মুক্তা, মণি, সব রকম ধন-সম্পদ। আবার সেখানে ছিল মূল্যহীন জিনিসও। বলা হলো, “তোমাদের সময় সীমিত—একদিন ও একরাত, যা পারো সংগ্রহ করে জাহাজে তোলো।”
১. প্রজ্ঞাবানরা:
তারা রাত-দিন পরিশ্রম করে রত্ন সংগ্রহ করে। বিশ্রাম ভুলে তারা চিন্তা করে—এই অল্প সময়ে যা সংগ্রহ করবো, তা-ই আখেরাতে কাজে লাগবে।
২. মাঝারি গোষ্ঠী:
তারা কিছু সংগ্রহ করে, কিছু সময় বিশ্রাম নেয়।
৩. গাফেলরা:
তারা কিছুই নেয় না, খালি খেলাধুলা, ঘরবাড়ি তৈরি, অথবা মূল্যহীন বস্তু সংগ্রহ করে—কারণ তারা বলে, “হাতের কিছুই ভালো, ভবিষ্যতের আশার চেয়ে!”
৪. সীমালঙ্ঘনকারী:
তারা রাজপ্রাসাদে ঢুকে পড়েছে—অন্যায়ভাবে মালামাল লুট করেছে, সীমালঙ্ঘন করেছে। বলেছে, “এই দ্বীপই আমাদের স্থায়ী বাসস্থান!”
শেষে কি হলো?
সবার ফিরে যাওয়ার সময় হলো।
• প্রজ্ঞাবানরা ফিরে গেলো রত্নে পরিপূর্ণ ঝুলিতে।
• মাঝারিরা আফসোস করলো—যেহেতু কম সংগ্রহ করেছিলো।
• গাফেলরা কাঁদতে লাগলো—একেবারেই খালি হাতে!
• সীমালঙ্ঘনকারীদের গলায় শেকল পরানো হলো—রাজপ্রাসাদের জিনিস লুট করার শাস্তিস্বরূপ।
রাজপ্রাসাদে পৌঁছার পর:
• যারা রত্ন এনেছে—তাদের সম্মান দেওয়া হলো, রাজাদের আসনে বসানো হলো।
• যারা কিছু আনেনি—তারা লজ্জিত ও অনুতপ্ত।
• যারা অপরাধ করেছিল—তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হলো, জাহান্নামের দিকে টেনে নেওয়া হলো। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হলো, “তারা ধৈর্য ধরলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস, আর তারা ক্ষমা চাইলে তাও কবুল হবে না।”[৫]
উপসংহার:
হে পাঠক, এই ছোট জীবনের সময়টি অমূল্য রত্নস্বরূপ। এই সময়টাই আখিরাতের গন্তব্য নির্ধারণ করবে। তাই—
মনকে ব্যস্ত রাখো:
• আল্লাহর নেয়ামত স্মরণে—শুকরিয়া আদায় করো,
• গুনাহ স্মরণে—তওবা করো,
• সময় অপচয় স্মরণে—অনুতপ্ত হও,
• আল্লাহর সৃষ্টির গভীরতা চিন্তা করো—তাঁর গুণাবলি বুঝার জন্য।
জিহ্বাকে নিয়োজিত রাখো:
• আল্লাহর যিকির, দো‘আ, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াতে,
• উপদেশ দেওয়া, হিদায়াত প্রদান, শিক্ষা দেওয়া ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যস্ত থাকুক:
• সালাত আদায়ে,
• মানুষের কল্যাণে,
• বিশেষ করে দীনি কল্যাণে—যা তাদের হেদায়াতের দিকে আনে।
সাবধান থেকো:
• এমন কিছু থেকে যা আমল নষ্ট করে ফেলে,
• যাতে তুমি পার্থিব জীবনও হারাও, আবার আখিরাতও পাবে না!
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّ وَعۡدَ ٱللَّهِ حَقࣱّۖ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِٱللَّهِ ٱلۡغَرُورُ ٥﴾ [فاطر: ٥]
“হে মানুষ! নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। অতএব, দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে, এবং প্রতারক যেন আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের প্রতারিত না করে।”[৬]