আল্লাহকে সত্তাগত (بذاته) উপরে বলা কেন জরুরী?
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহর আলেমগণ বলে থাকেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর বান্দাদের ওপর নিজ সত্তাসহ (بذاته) আছেন এবং তিনি তাঁর আরশের ওপর নিজ সত্তাসহ (بذاته) আরোহন করেছেন।”
আশআরী-সুফিদের দাবি:
তারা বলে— এই “নিজ সত্তাসহ (بذاته)” শব্দগুচ্ছ কুরআন ও হাদীসের কোনো নাসে (স্পষ্ট বাণীতে) আসেনি। তাই তাদের মতে, এই শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই; কারণ আহলুস সুন্নাহর মূলনীতি হলো — আল্লাহর নাম ও গুণাবলী তাওকীফি (অর্থাৎ কেবল কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত)। কিন্তু এই কথায় গুরুতর ভুল আছে দুই দিক থেকে:
প্রথমত:
“بذاته” (নিজ সত্তাসহ) এই শব্দটি বহু সালাফ ব্যবহার করেছেন। এমনকি একাধিক আলিম এ বিষয়ে ইজমা (ঐকমত্য)-এর বর্ণনাও দিয়েছেন। এবং কেউ তাঁদের এই ব্যবহারে আপত্তি করেননি, যেমনটা আশআরী-সূফীরা দাবি করে থাকে।
এটি এমনই যেমন সালাফগণ বলতেন:
• “غير مخلوق” (অমাখলুক / সৃষ্টি নয়)
• “بائن من خلقه” (নিজ সৃষ্টির থেকে পৃথক।)
যে ব্যক্তি “بذاته” শব্দটি অস্বীকার করবে, তাকেও এই শব্দগুলো অস্বীকার করতে হবে, যার মানে দাঁড়াবে — সালাফদের বিভ্রান্ত বলা! শুধুমাত্র হাফিয যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) শব্দ ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করেছেন, তিনি বলেছেন: “এটি পরিহার করাই উত্তম।” কিন্তু তিনি বলেননি যে এটি বিদ‘আত।
যেসব সালাফ “بذاته” শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন,
- মুহাম্মাদ ইবন উসমান ইবন আবি শাইবা বলেছেন:
“তারপর প্রচুর বর্ণনা এসেছে যে, আল্লাহ তাআলা আরশ সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাতে নিজ সত্তাসহ আরোহন করেছেন, তারপর সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী ও আসমান। অতঃপর তিনি পৃথিবীর উপরে, আসমানের উপরে এবং আরশের উপরে — নিজ সত্তাসহ উচ্চে অবস্থানকারী।”[১] - কাওয়ামুস সুন্নাহ আল-আসফাহানী বলেছেন:
ইয়াহইয়া ইবন আম্মার বলেছেন, “এই বিষয়ে (আল্লাহর আরশে আরোহন বিষয়ে) আমাদের অতিরিক্ত কিছু বলার প্রয়োজন নেই, আমরা শুধু বিশ্বাস রাখব, এর কেমন (কাইফিয়াহ) তা জানার চেষ্টা করব না, এতে সন্দেহ করব না, বরং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যা বলেছেন তা-ই সত্য। আমরা চিন্তা করব না, কল্পনা করব না, কোনো ধরণের ওসওয়াসা দেব না। আমরা দৃঢ়ভাবে জানি যে, মন বা চিন্তায় আল্লাহ সম্পর্কে যেভাবে কল্পনা আসবে, আল্লাহ তা‘আলা তেমন নন। আমরা বলি — আল্লাহ নিজ সত্তাসহ ‘আরশের ওপর, আর তাঁর জ্ঞান সবকিছু পরিব্যাপ্ত।”[২] - শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেছেন:
“শায়খ আবু নসর আস-সিজযী বলেছেন তাঁর ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে—আমাদের ইমামগণ যেমন সুফিয়ান আস-সাওরী, মালিক, সুফিয়ান ইবন উয়ায়না, হাম্মাদ ইবন সালামা, হাম্মাদ ইবন যায়দ, আবদুল্লাহ ইবন মুবারক, ফুযাইল ইবন ঈয়ায, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবন ইবরাহীম — এরা সবাই একমত যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর সত্তাসহ আরশের ওপর, আর জায়গার জ্ঞান তাঁর কাছে, এবং কিয়ামতের দিন তিনি আরশের ওপরে মানুষদের দ্বারা দেখা যাবেন, তিনি নিকটতম আসমানে নাজিল হন, রাগান্বিত হন, সন্তুষ্ট হন, ইচ্ছামতো কথা বলেন। যে কেউ এসব বিষয় বলতে ভীত হয়, সে তাঁদের দলভুক্ত নয়।”[৩]
এর দ্বারা ইজমা বা ঐকমত্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। - আবার শায়খুল ইসলাম একই গ্রন্থে বলেছেন:
“শায়খ আবু উমর আত-তালামানকী আল-মালিকী বলেছেন ‘আল-উসূল’ গ্রন্থে: মুসলিমগণ — আহলুস সুন্নাহ — সর্বসম্মত যে, আল্লাহর বাণী ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ﴾[৪] এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে আছেন, আর তিনি আসমানের ওপরে নিজ সত্তাসহ আরশের ওপর যেমন তিনি চান।” - শায়খুল ইসলাম আরো বলেছেন:
“আবুল হাসান আল-আশআরী এবং তাঁর প্রারম্ভিক অনুসারীরাও বলতেন — ‘আল্লাহ নিজ সত্তাসহ আরশের ওপর’, এবং সঙ্গে তারা এটাও বলতেন যে, আল্লাহ কোনো জিসম (দেহ) নন।”[৫] অর্থাৎ আশআরীদের প্রাথমিক প্রজন্মও এই শব্দটি ব্যবহার করতেন।
দ্বিতীয়ত:
কেউ প্রশ্ন করতে পারে: “যেহেতু এই শব্দগুলো কুরআন ও হাদীসে নেই, তবে এর উপকারিতা কী?” তাহলে উত্তর হলো: এই শব্দগুলো দ্বারা কোনো নতুন গুণ (صفة) প্রমাণ করা হয়নি। বরং এগুলো হলো স্পষ্ট ব্যাখ্যা — যাতে জাহমিয়্যাদের বিকৃত ব্যাখ্যা প্রতিহত করা যায়।
যেমন,
• যখন সালাফগণ বলতেন “কুরআন মাখলুক নয় (غير مخلوق)”, এর উদ্দেশ্য ছিল এই বিশ্বাস স্থির করা যে আল্লাহর “কথা বলা” একটি গুণ, এবং আল্লাহর গুণাবলী কখনোই সৃষ্টি নয়।
• একইভাবে “بائن من خلقه” বা “بذاته” বলা হয় আল্লাহর উর্ধ্বতা (علوّ) স্পষ্ট করার জন্য। কারণ আল্লাহর উচ্চতার বিষয়ে (عُلوّ الله) কুরআন ও হাদীসের দলিলগুলো অত্যন্ত বিপুল ও স্পষ্ট।
এই শব্দগুলোর ব্যবহার কেন দরকার ছিল?
যারা সালাফদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা বোঝে, তারা জানে — এই শব্দগুলো ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল জাহমিয়্যাদের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা থেকে নিজেদের মতকে আলাদা করা।
উদাহরণ:
জাহমি বলতো: “কুরআন আল্লাহর কালাম” — কিন্তু সে “কালাম” শব্দের অর্থ নিত সৃষ্ট বস্তু, যেমন “আল্লাহর উট”, “আল্লাহর ঘর” ইত্যাদি। তখন সালাফ বলতেন “غير مخلوق” — যেন স্পষ্ট হয়, কুরআন আল্লাহর কালাম, এবং আল্লাহর একটি গুণ, যা সৃষ্টি নয়। তেমনি জাহমি বলত: “আল্লাহ আরশের ওপর আছেন” — কিন্তু সে বোঝাতো “আল্লাহ তাঁর জ্ঞানের দ্বারা আছেন”, বা “আল্লাহ আরশের ওপরও আছেন, নিচেও আছেন।” তখন সালাফ বলতেন: “بائن من خلقه” বা “بذاته” — যেন বোঝায়, আল্লাহ সত্যিই তাঁর সৃষ্টির থেকে পৃথকভাবে আরশের ওপর আছেন, জাহমিদের বুঝের মতো নয়।
এই জন্যই জাহমিয়্যারা সালাফদের এই ভাষা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ এতে আল্লাহর গুণাবলীর বাস্তব প্রতিষ্ঠা খুব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
অতএব, এই শব্দগুলোর ব্যবহার “অতিরিক্ত কথা” নয়, বরং গভীর ফিকহ ও সুগভীর বোধের ফল। সুতরাং, যখন সালাফগণ এই শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং কেউ তাতে আপত্তি করেননি, তখন এই শব্দ অস্বীকার করা জায়েয নয়। এভাবেই আমরা এই শব্দ ব্যবহারের উৎস ও ভিত্তি তোমার সামনে স্পষ্ট করেছি।