ইয়াজুজ ও মাজুজ: কারা, কোথায় বন্দী, আবির্ভাব ও ধ্বংস
একদিন নবী ﷺ ঘুম থেকে ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে জেগে উঠলেন এবং তাঁর স্ত্রী যয়নব বিনতে জাহাশ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা-এর ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনি বললেন,
لا إله إلا الله، ويل للعرب من شر قد اقترب، فُتح اليوم من سدِّ يأجوج ومأجوج مثل هذه.
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আরবদের জন্য দুর্ভোগ! এক ভয়াবহ অশুভের আগমন নিকটে এসে গেছে। আজ ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ’-এর বাঁধ থেকে এমনটুকু (অঙ্গুলির ইশারায় দেখালেন) ফাঁক হয়েছে।” (তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী মিলিয়ে দেখালেন) তখন যয়নব বিনতে জাহাশ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি ধ্বংস হবো, যখন আমাদের মধ্যে সৎ লোকেরাও রয়েছে?” তিনি ﷺ বললেন, “হ্যাঁ, যখন সমাজে অশুভ ও পাপাচার বেড়ে যাবে!”
ইয়াজুজ ও মাজুজ কারা?
ইয়াজুজ ও মাজুজ দুটি জাতি, তারা মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত—নবী নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর পুত্র ইয়াফিস-এর বংশধর। তারা অত্যন্ত দুষ্ট, ধ্বংসাত্মক ও বর্বর জাতি। তাদের নেতা আছে, তারা বিশাল আকারের ও শক্তিশালী।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন, যখন যুল-কারনাইন তাদের বিরুদ্ধে দেয়াল নির্মাণ করেন, তখন থেকেই তারা প্রতিদিন দেয়ালটি ভাঙার চেষ্টা করে। তারা সারাদিন খোঁড়ে, কিন্তু রাতে বিশ্রাম নিতে গিয়ে বলে, “আগামীকাল এসে বাকিটা করব।” কিন্তু সকালে এসে দেখে — যা খুঁড়েছিল তা আবার আগের মতো হয়ে গেছে। এভাবে তারা প্রতিদিন চেষ্টা করে যাবে, যতদিন না আল্লাহ তাদের বের হওয়ার অনুমতি দেন।
যুল-কারনাইন ও দেয়াল নির্মাণের কাহিনি
আল্লাহ বলেন:
﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَن ذِي الْقَرْنَيْنِ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُم مِّنْهُ ذِكْرًا﴾ [الكهف: ۸۳]
“তারা তোমার কাছে যুল-কারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, আমি তোমাদের কাছে তার কিছু বিবরণ পাঠ করব।”[১]
যুল-কারনাইন ছিলেন পৃথিবীর এক শক্তিশালী রাজা। আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত শাসন করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি প্রথমে পশ্চিম দিকে গেলেন (সূর্য অস্ত যায় যেখানে) — সেখানে এমন এক জাতি পেলেন যারা আল্লাহকে চিনত না। তিনি তাদের সুন্দরভাবে আল্লাহর পথে আহ্বান করলেন, তারা ঈমান আনল। এরপর তিনি পূর্ব দিকে গেলেন (যেখান থেকে সূর্য ওঠে) — সেখানে এমন এক জাতিকে পেলেন যারা সূর্যের তাপে বসবাস করত, কোনো আশ্রয় ছিল না। তিনি তাদের জন্য ঘরবাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণ করলেন। পরে তিনি উত্তর দিকে গেলেন — দুই পর্বতের মাঝখানে। সেখানে এমন কিছু লোক ছিলেন যারা কোনো ভাষা বুঝতেন না। তাদের অঞ্চলে একদল ভয়ঙ্কর জাতি — ইয়াজুজ ও মাজুজ — হানা দিত, মানুষ হত্যা করত, সম্পদ লুট করত, ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। তারা যুল-কারনাইনের কাছে অনুরোধ করল, “আমাদের ও এই মুফসিদ জাতির মাঝে একটি শক্তিশালী দেয়াল তৈরি করুন।” যুল-কারনাইন তাদের অনুরোধ গ্রহণ করলেন। তিনি লোহা দিয়ে বিশাল প্রাচীর বানালেন, তার নিচে আগুন জ্বালিয়ে লোহা গলিয়ে তার উপর তামা ঢেলে দিলেন। এতে দেয়ালটি অত্যন্ত মজবুত হয়ে গেল — ইয়াজুজ ও মাজুজ তা ভেদ করতে বা উপরে উঠতে পারল না।
ইয়াজুজ ও মাজুজের আবির্ভাব
ইয়াজুজ ও মাজুজের আগমন হবে কিয়ামতের বড় নিদর্শনগুলোর একটি। সহীহ মুসলিমে নাওয়াস ইবনু সাম’আন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে বলা হয়েছে: যখন আল্লাহ তাদের বের হওয়ার অনুমতি দেবেন, তখন তারা দেয়ালে বিশাল ফাঁক করবে। তাদের নেতা বলবে, “আগামীকাল ইনশাআল্লাহ এসে বাকিটা শেষ করব।” এইবার তারা “ইনশাআল্লাহ” বলায়, আল্লাহ তাদের জন্য অনুমতি দেবেন — ফলে তারা দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, সবদিকে হামলে পড়বে। তারা পৃথিবীজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে — নদী ও হ্রদের পানি পান করে শেষ করবে, এমনকি তাবারিয়া হ্রদ পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলবে। তারা যত কিছু পাবে—মানুষ, পশু, গাছ—সব ধ্বংস করবে। মানুষ ভয়ে আশ্রয় নেবে, লুকিয়ে পড়বে। তাদের ঔদ্ধত্য এত বাড়বে যে তারা বলবে: “আমরা পৃথিবীর লোকদের মেরে ফেলেছি, এবার আকাশের লোকদের মেরে ফেলি।” তাদের একজন বর্শা আকাশের দিকে নিক্ষেপ করবে, আল্লাহ তা রক্তমাখা অবস্থায় ফেরত দেবেন— এটি হবে তাদের জন্য ফিতনা (পরীক্ষা)। তারা অহংকার করে বলবে: “আমরা পৃথিবীর বাসিন্দাদের হত্যা করেছি, আকাশের লোকদেরও পরাজিত করেছি!”
তাদের শেষ ও ধ্বংস
তারা ঈসা আলাইহিস সালাম-এর আগমনের পর বের হবে। যখন দজ্জাল নিহত হবে, তখন আল্লাহ তাআলা (আলাইহিসসালাম)-কে নির্দেশ দেবেন যেন তিনি মুসলিমদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেন। এরপর আল্লাহ ইয়াজুজ ও মাজুজকে ধ্বংস করবেন— তাদের শরীর থেকে এক বিশেষ জীবাণু বা কীট (النغف) বের হবে, যা তাদের নাক ও মাথার পেছনে ঢুকে সবাইকে হত্যা করবে। পৃথিবী তাদের মৃতদেহে ভরে যাবে, ভয়াবহ দুর্গন্ধ ছড়াবে। তারপর আল্লাহ পাখি পাঠাবেন, যারা তাদের দেহ মাটি থেকে সরিয়ে নেবে। এরপর আল্লাহ প্রবল বৃষ্টি নামাবেন যা পৃথিবীকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবে।
এরপরের সুন্দর যুগ
তারপর মানুষ শান্তিতে, সুখে ও সমৃদ্ধিতে জীবনযাপন করবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«طوبَى لعيشٍ بعدَ المسيحِ ، طوبى لعيشٍ بعدَ المسيحِ ، يؤذَنُ للسَّماءِ في القَطرِ ، ويؤذَنُ للأرضِ في النَّباتِ فلو بذرتَ حبَّكَ على الصَّفا لنبتَ ، ولا تَشاحَّ ولا تحاسُدَ ولا تباغضَ حتَّى يمرَّ الرَّجلُ على الأسدِ ولا يضرُّهُ ، ويطأُ على الحيَّةِ فلا تضرُّهُ ، ولا تشاحَّ ولا تحاسدَ ولا تباغضَ»
“সুখবর সেই জীবনের জন্য, যা মসীহ (ঈসা আলাইহিসসালাম)-এর পর হবে। আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের অনুমতি দেওয়া হবে, জমিনকে উদ্ভিদ উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হবে। এমনকি তুমি যদি কঠিন পাথরের উপর বীজ ফেলো, সেটাও গজাবে। মানুষ সিংহের পাশে দিয়ে যাবে, সিংহ তাকে ক্ষতি করবে না; সাপের উপর পা রাখবে, সাপ তাকে কামড়াবে না। কারো প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ বা লড়াই থাকবে না।”
দোআ
اللهم أجرنا من فتنة الدجال ومن قوم يأجوج ومأجوج ومن أهوال يوم القيامة
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে দজ্জালের ফিতনা থেকে, ইয়াজুজ-মাজুজের অনিষ্ট থেকে এবং কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করুন।”
- [১]সূরা আল-কাহফ: ৮৩।