ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ
জন্ম ও বংশ পরিচয়
ইবন তাইমিয়্যাহর পুরো নাম আবুল আব্বাস তকিউদ্দীন আহমাদ ইবনু আব্দুল হালিম ইবনু আব্দুস সালাম আন-নুমাইরি আল-হাররানি। তিনি শাইখুল ইসলাম উপাধিতে অধিক পরিচিত। তিনি ২২ জানুয়ারি ১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে (১০ রবিউল আউয়াল ৬৬১ হিজরি) রুম সালতানাতের হাররান (বর্তমান সিরিয়া/তুরস্ক সীমান্ত অঞ্চল) এলাকায় এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল হালিম এবং দাদা আবুল বারাকাত মাজদুদ্দীন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও হাম্বলী ফকিহ ছিলেন। উল্লেখ্য, ‘তাইমিয়্যাহ’ ছিলেন তাঁর নানীর নাম।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
তাতারীদের (মঙ্গোল) আক্রমণের কারণে ইবন তাইমিয়্যাহর পরিবার মাত্র সাত বছর বয়সে সিরিয়ার দামেস্কে হিজরত করে। তাঁর পিতা দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ ও দারুল হাদিস আস-সুক্কারিয়া মাদ্রাসায় অধ্যাপনার দায়িত্ব পান। অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী কিশোর ইবন তাইমিয়্যাহ পিতার তত্ত্বাবধানে কুরআন হিফজ করেন এবং হাদিস, ফিকহ ও আরবি ভাষার চর্চায় গভীর পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি দুই শতাধিক উস্তাদের কাছ থেকে হাদিস শেখেন এবং কুরআনের জ্ঞান অর্জনে শতাধিক তাফসির গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।
জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষকতা
পিতা শিহাবুদ্দীন আব্দুল হালিমের মৃত্যুর পর ১২৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি সুক্কারিয়্যা মাদ্রাসায় প্রধান মুহাদ্দিস হিসেবে হাদিসের দরস দেওয়া শুরু করেন এবং পরবর্তীতে উমাইয়া মসজিদে তাফসিরের দায়িত্ব নেন। ১২৯২ সালে হজ পালন শেষে তাঁর প্রথম গ্রন্থ মানাসিক আল-হজ রচনা করেন। তিনি হাম্বলী মাযহাবের নীতিতে শিক্ষিত হলেও অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) বর্জন করে ইজতিহাদের আহ্বান জানান। তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন, কখনো বিয়ে করেননি এবং কোনো সরকারি কাজী পদ গ্রহণ করেননি।
রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা
১২৯৩ সালে মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারী এক যাজকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি প্রথম কারাদণ্ডের মুখোমুখি হন এবং বন্দিদশায় আল-সারিম আল-মাসলুল গ্রন্থটি রচনা করেন। ১২৯৯-১৩০৩ সালে লেভান্টে মঙ্গোল আক্রমণের সময় তিনি দামেস্কের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৩০৩ সালে বিখ্যাত মারজ আল-সাফফারের যুদ্ধে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হাতে তরবারি নিয়ে মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং তাদের পরাজয় নিশ্চিত করেন।
বিতর্ক ও কারাবাস
প্রচলিত সামাজিক-ধর্মীয় রীতিনীতি, সুফি চর্চা, আশআরি আকিদা, তাওয়াসসুল (উসিলা গ্রহণ) ও এক আসরে তিন তালাক ফতোয়া নিয়ে সমকালীন আলেম ও মামলুক শাসকদের সঙ্গে তাঁর একাধিক বিরোধ তৈরি হয়। এসব মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক কারণে তিনি কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও দামেস্কে জীবনে বেশ কয়েকবার কারারুদ্ধ ও গৃহবন্দি হন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ
ইবন তাইমিয়্যাহ ৫০০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হলো:
- মাজমু আল-ফাতাওয়া
- মিনহাজ আস-সুন্নাহ আন-নাবাবিয়্যাহ
- আল-আকিদাহ আল-ওয়াসিতিয়্যাহ
- দার তাআরুদ আল-আকল ওয়ান-নাকল
- আল-জাওয়াব আস-সহীহ
মৃত্যু
১৩২৬ সালে কবর জিয়ারত ও সফর সংক্রান্ত এক ফতোয়ার কারণে তাঁকে পুনরায় দামেস্কের দুর্গে কারারুদ্ধ করা হয়। অবশেষে ২৬ সেপ্টেম্বর ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে (২০ জিলকদ ৭২৮ হিজরি) ৬৫ বছর বয়সে দামেস্ক দুর্গে বন্দি অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দামেস্কের ‘মাকবারা সুফিয়্যাহ’ (সুফি গোরস্থান)-এ তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর জানাজায় প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
