সহীহ হাদীস বিশ্বকোষ
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ দ্বিয়াউর রহমান আল-আ‘যামী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-জামে‘উল কামেল’ রচনার সময় হাদীসের সনদ ও তার বিশদ বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে গ্রন্থটি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হলেও সাধারণ পাঠকের কাছে এর বিস্তৃত আলোচনা কিছুটা কঠিন ও ভারী মনে হতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেক আগ্রহী পাঠক শাইখের কাছে মূল গ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশের অনুরোধ জানান।
শাইখ প্রথমদিকে এসব প্রস্তাবে সম্মত না হলেও পরবর্তীতে হাদীস ও হাদীসের মান নির্ণয়ের আলোচনাকে কেন্দ্র করে মূল গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত রূপ প্রণয়ন করেন। এর নাম দেন ‘তালখীস আল-জামে‘উল কামেল ফিল হাদীস আস-সহীহ আশ-শামেল’। পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত এই আরবি গ্রন্থটিই আমাদের অনূদিত ও সম্পাদিত ‘সহীহ হাদীস বিশ্বকোষ’ দুই খণ্ডে।
সংক্ষিপ্ত ‘আল-জামে‘উল কামেল’ হাদীস গবেষণা ও পাঠের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। গ্রন্থকার শাইখ ড. দ্বিয়াউর রহমান আল-আ‘যামী নিজেই গ্রন্থটি সংকলনের ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতিমালা ও মানদণ্ড বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর নির্ধারিত এসব নীতির আলোকে অনুবাদক প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া গ্রন্থটির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন:
১. বিশুদ্ধ হাদীসের সংকলন
এ গ্রন্থে এমন কোনো হাদীস স্থান পায়নি, যেটিকে কোনো আলেমই বিশুদ্ধ বলে গণ্য করেননি। এতে সহীহ ও হাসান—উভয় শ্রেণির গ্রহণযোগ্য হাদীস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে সহীহ লিযাতিহী, সহীহ লিগাইরিহী, হাসান লিযাতিহী ও হাসান লিগাইরিহী—এই চার ধরনের হাদীসই গ্রন্থটিতে পাওয়া যায়।
২. হাদীসের মান ও উৎসের নির্দেশনা
প্রতিটি হাদীস উল্লেখ করার পর শুরুতেই তার হুকুম বা মান স্পষ্ট করা হয়েছে। এরপর হাদীসটি কোন কোন হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, সেসব উৎসের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৩. ইমাম বুখারীর অধ্যায় বিন্যাসের অনুসরণ
গ্রন্থের অধ্যায় বিন্যাসে অনেকাংশে ইমাম বুখারীর পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা হয়েছে, ফলে হাদীসের বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপন আরও সুসংগঠিত হয়েছে।
৪. আকীদাহ-সংক্রান্ত হাদীসের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব
আকীদাহ বিষয়ক হাদীসগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে সংকলন করা হয়েছে। বিশেষত বিশুদ্ধ ইসলামী আকীদাহ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হাদীসগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫. আল্লাহর নাম ও গুণাবলি বিষয়ক হাদীস
আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সংক্রান্ত হাদীসগুলো শুধু প্রচলিত হাদীসগ্রন্থ থেকেই নয়; সনদসহ বর্ণিত আকীদাহ বিষয়ক গ্রন্থ থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছে।
৬. পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে বিষয়ভিত্তিক নির্বাচন
কোনো একটি অধ্যায়ের আলোচনার সঙ্গে যতটুকু অংশ প্রাসঙ্গিক, মূলত ততটুকুই সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই হাদীস বা বক্তব্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার উল্লেখ না করার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
৭. দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা
হাদীসের যেসব শব্দ সাধারণ পাঠকের জন্য কঠিন বা দুর্বোধ্য হতে পারে, সেগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রন্থকার নিজেই প্রদান করেছেন।
৮. তাফসীর-সংক্রান্ত হাদীসের সুবিন্যস্ত সংকলন
কুরআনের তাফসীরের বিভিন্ন প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীসগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে একত্রিত ও সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণিত হাদীসগুলো এক জায়গায় পাওয়া সহজ হয়েছে।
৯. সনদের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা
গ্রন্থকার নিজে প্রতিটি হাদীসের সনদ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেছেন। হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে সনদের যথাযথ যাচাই-বাছাই এ গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।